সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করার বিষয়টি ভারত-বাংলাদেশ উত্তেজনা বাড়ালেও তিস্তায় নতুন করে গতি সঞ্চার আস্থা ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের একটি পথ দেখাচ্ছে।
২০২৬ সালের ৯ মে বিপুল নির্বাচনী বিজয়ের পর পশ্চিমবঙ্গে একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে। বাংলার জনগণের উদ্দেশ্যে নতুন শাসক দল বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলির মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা তালিকার শীর্ষে রয়েছে। এটি কেন্দ্রের বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট সরকারের দীর্ঘদিনের উদ্বেগেরই প্রতিধ্বনি, যা পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তের বেড়াবিহীন ও কম সুরক্ষিত অংশ দিয়ে বাংলাদেশ থেকে কথিত অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। নতুন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের পরবর্তী দ্রুত পদক্ষেপগুলি বাংলাদেশের কিছু কট্টরপন্থীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। সর্বোপরি, বাংলাদেশের কাছে পশ্চিমবঙ্গ শুধু আর একটি ভারতীয় রাজ্য নয়, বরং তার চেয়েও বেশি কিছু; উভয়েরই অভিন্ন সম্পদ, নানা পারিবারিক সম্পর্ক এবং দেশভাগের ইতিহাস রয়েছে। তাই ‘এক পক্ষের যে কোনও চাপ দ্রুত অপর পক্ষেও প্রতিধ্বনিত হয়।’ এ হেন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উপর এই ঘটনাগুলির প্রভাব বিশ্লেষণ করা শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে এবং জনগণের মধ্যে সদ্ভাব বাড়াতে সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশের কাছে পশ্চিমবঙ্গ শুধু আর একটি ভারতীয় রাজ্য নয়, বরং তার চেয়েও বেশি কিছু; উভয়েরই অভিন্ন সম্পদ, নানা পারিবারিক সম্পর্ক এবং দেশভাগের ইতিহাস রয়েছে। তাই ‘এক পক্ষের যে কোনও চাপ দ্রুত অপর পক্ষেও প্রতিধ্বনিত হয়।’
সীমান্ত নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভূগোল
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার ‘অবৈধ অভিবাসী’দের গ্রেফতার করে নির্বাসনের জন্য সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। সরকার গঠনের ৪৫ দিনের মধ্যে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের অবশিষ্ট অংশে বেড়া দেওয়ার জন্য সীমান্ত জেলাগুলিতে বিএসএফ-কে জমি হস্তান্তরের অনুমোদনও দিয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সমগ্র সীমান্তের মধ্যে প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার ইতিমধ্যেই বেড়া দেওয়া হয়েছে এবং বাকি ৬০০ কিলোমিটার খোলা রয়েছে। প্রথম কিস্তিতে বিএসএফ-কে ২৭ কিলোমিটার জমি হস্তান্তর করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৮ কিলোমিটার বেড়া দেওয়ার জন্য এবং ৯ কিলোমিটার বিএসএফ ফাঁড়ি ও প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নির্মাণের জন্য দেওয়া হয়েছে। আরও জমি হস্তান্তর করা হবে, যার সমস্ত খরচ কেন্দ্র এবং বিএসএফ বহন করবে।
রাজ্য সরকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি করিডোরের ১২০ একর জমি কেন্দ্রের কাছে হস্তান্তরের অনুমোদনও দিয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে সংযোগকারী ভূখণ্ডের সরু ফালিটি তার কৌশলগত দুর্বলতার কারণে ‘চিকেন’স নেক’ নামে পরিচিত। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু ঘটনার কারণে নয়াদিল্লি এর অলঙ্ঘ্যনীয়তা নিয়ে বিশেষ ভাবে শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভূখণ্ডগত দুর্বলতা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য, লালমনিরহাটে একটি বিমানঘাঁটি তৈরির জন্য চিনের সঙ্গে তাঁর কথিত মতবিনিময় এবং তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বেজিংয়ের প্রস্তাব গ্রহণ। উভয় প্রকল্পই চিনকে ভারতীয় সীমান্তের আরও কাছে নিয়ে আসার ঝুঁকি তৈরি করেছিল। ঢাকার বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারও তিস্তা প্রকল্পটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে, যা নয়াদিল্লিতে কৌশলগত সংবেদনশীলতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বাংলাদেশে এর প্রভাব
ভারত সরকার উপরোক্ত পদক্ষেপগুলিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়ন শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় মনে করে এবং বাংলাদেশের কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলি এর ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়। নতুন সরকার যে দ্রুততার সঙ্গে সীমান্ত বেড়া নির্মাণ, কথিত নির্বাসন, ভূমি হস্তান্তর এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, তা এই উদ্বেগগুলিকে আরও তীব্র করেছে। পশ্চিমবঙ্গে ‘অবৈধ’ সম্পত্তি লক্ষ্য করে চালানো উচ্ছেদ অভিযানও এই বয়ানকে আরও উস্কে দিয়েছে, যার ফলে আন্দোলনকারীরা দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলার পদক্ষেপগুলিকে আন্তঃসীমান্ত প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করার সুযোগ পাচ্ছে।
যেহেতু এ ক্ষেত্রে জল রাজ্যের বিষয় এবং ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী দ্বিপাক্ষিক সিদ্ধান্তগুলি কেন্দ্রীয় এক্তিয়ারভুক্ত, তাই তিস্তা সমস্যাটি একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় অচলাবস্থায় জড়িয়ে পড়ে, যার ফলে এর নিষ্পত্তি অসম্ভব হয়ে যায়।
প্রায় দেড় বছরের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও রাজনৈতিক টানাপড়েনের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা তারেক রহমান প্রশাসনের জন্য সমস্যাটি দ্বিমুখী। ঢাকা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে যে, ভারতে কথিত অবৈধ অভিবাসনের সংখ্যা অতিরঞ্জিত এবং এই কারণে তারা বাংলাদেশি নাগরিকত্বের সুস্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া নির্বাসিতদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের সংখ্যায় আকস্মিক বৃদ্ধি বিএনপি সরকারের জন্য একটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যা সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে উস্কানিমূলক ডিজিটাল কন্টেন্ট বা বিষয়বস্তু এমন একটি দেশে জনবিক্ষোভকে উস্কে দিতে পারে, যেখানে সাম্প্রতিক মাসগুলিতে ভারত-বিরোধী মনোভাব রাজনৈতিক ভাবে প্রকট হয়ে রয়েছে। এটি বিএনপি সরকারের বৈধতা এবং নয়াদিল্লির সঙ্গে একটি কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিতে পারে। এটি কেবল নির্বাসন ব্যবস্থাপনায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাকেই নির্দেশ করে না, বরং সীমান্তের উভয় পারের মানুষের জন্য আস্থা-নির্মাণকারী পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করতে পারে এমন সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলি চিহ্নিত করার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরে। এমনই একটি ক্ষেত্র হল তিস্তা নদী নিয়ে বিরোধ।
রাজনৈতিক সংশোধন হিসেবে নদী কূটনীতি
ভারত ও বাংলাদেশের ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদীর মধ্যে তিস্তা নদী সিকিম ও উত্তর পশ্চিমবঙ্গের পার্বত্য অঞ্চল থেকে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের অপেক্ষাকৃত নিচু রংপুর বিভাগে পড়েছে। উত্তর বাংলাদেশের প্রধান নদী হিসেবে এটি এক কোটিরও বেশি মানুষের কৃষি চাহিদা মেটায় এবং দেশের মোট ফসল উৎপাদনের ১৪ শতাংশ জোগান দেয়। তবে বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের মতে, উজানে নির্মিত ভারতীয় বাঁধগুলি তাদের দেশে নদীর জলপ্রবাহ কমিয়ে দিয়েছে, যা এক লক্ষ হেক্টরেরও বেশি জমির সেচকে বাধাগ্রস্ত করছে। বাঁধগুলি নির্মাণের আগে দেশে প্রায় ৬,৭১০ কিউসেক (ঘনফুট প্রতি সেকেন্ড) জল আসত, যা বর্তমানে শুষ্ক মরসুমে কমে মাত্র ১,২০০-১,৫০০ কিউসেক হয়েছে এবং কখনও কখনও ২০০-৩০০ কিউসেক জল পাওয়া যায়। এটি দেশের দৈনিক ৫,০০০ কিউসেক জলের চাহিদার চেয়ে অনেক কম। স্বাভাবিক ভাবেই, উভয় দেশই একটি সমাধানে পৌঁছনোর চেষ্টা করেছে।
১৯৮৩ সালে ২৫তম যৌথ নদী কমিশনে একটি অস্থায়ী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের তিস্তার ৩৬ শতাংশ জল পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর শর্তগুলি পূরণ করা হয়নি। ২০১১ সালে আর একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে ভারতকে ৪২.৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশকে ৩৭.৫ শতাংশ জল বরাদ্দ করা হয়। তবে পশ্চিমবঙ্গের পূর্ববর্তী সরকারের আপত্তির কারণে চুক্তিটি আনুষ্ঠানিক রূপ পায়নি। তাদের যুক্তি ছিল যে, রাজ্যের ক্রমবর্ধমান জলের চাহিদা এবং নদীর জলপ্রবাহ কমে যাওয়ায় প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থাটি অগ্রহণযোগ্য। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে আরও জল ভাগাভাগি করা হলে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেহেতু এ ক্ষেত্রে জল রাজ্যের বিষয় এবং ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী দ্বিপাক্ষিক সিদ্ধান্তগুলি কেন্দ্রীয় এক্তিয়ারভুক্ত, তাই তিস্তা সমস্যাটি একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় অচলাবস্থায় জড়িয়ে পড়ে, যার ফলে এর নিষ্পত্তি অসম্ভব হয়ে যায়।
তিস্তা সমস্যার সমাধানে পুনরায় মনোযোগ দিলে তা কেবল নয়াদিল্লিকে বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাব প্রশমিত করতেই সাহায্য করবে না, বরং তারেক রহমান সরকারের জনপ্রিয় বৈধতাও বাড়িয়ে তুলবে।
ফলস্বরূপ, এটি ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী বিবাদের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বাংলাদেশের একাংশের মধ্যে ভারত-বিরোধী মনোভাবকে উস্কে দিয়েছে। তাই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, ঢাকার অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন এবং পরবর্তী বিএনপি সরকার ভারতের অনুরূপ প্রস্তাবের পরিবর্তে তিস্তার কিছু অংশ ড্রেজিং ও বাঁধ দিয়ে একটি বহুমুখী ব্যারেজ নির্মাণের চিনের প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল। তবে নয়াদিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে কেন্দ্র-রাজ্য জোট এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় তিস্তা সমস্যার সমাধানে রাজনৈতিক বাধা কম থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি এই ধরনের একটি নিষ্পত্তির ফলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি পারস্পরিক লাভজনক জল বণ্টন চুক্তি হয়, তবে তা কেবল উভয় সরকারের জন্যই একটি উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক বিজয় হবে না, বরং জনসমর্থন পুনরুদ্ধারেও সহায়তা করবে।
তিস্তা সমস্যার সমাধানে পুনরায় মনোযোগ দিলে তা কেবল নয়াদিল্লিকে বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাব প্রশমিত করতেই সাহায্য করবে না, বরং তারেক রহমান সরকারের জনপ্রিয় বৈধতাও বাড়িয়ে তুলবে। সুতরাং, এই কূটনৈতিক উত্তেজনার মুহূর্তে ভারত ও বাংলাদেশকে অবশ্যই সেই সব রাজনৈতিক আখ্যান পুনর্বিবেচনা করতে হবে যা সন্দেহ ও ক্ষোভকে বাড়িয়ে তোলার পরিবর্তে উভয় দেশের অভিন্ন স্বার্থ, নদী-কূটনীতি এবং জনকেন্দ্রিক অর্জনকে গুরুত্ব দেবে এবং সাধারণ মানুষকে বিক্ষুব্ধ না করে বিতর্কিত সমস্যাগুলিকে উপযুক্ত সমাধানের দিকে নিয়ে যাবে।
সোহিনী বোস অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Sohini Bose is an Associate Fellow at Observer Research Foundation (ORF), Kolkata with the Strategic Studies Programme. Her area of research is India’s eastern maritime ...
Read More +