কৃষিক্ষেত্রে জলবায়ু ঝুঁকি বাড়তে থাকায় ভারতের শস্য বিমা প্রকল্পগুলিকে অবশ্যই নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে, যাতে সেই নারীদেরকেও এর আওতায় আনা যায়, যাঁরা কৃষিকাজের সিংহভাগ করেন কিন্তু জমির মালিকানার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বঞ্চিত।
কৃষিক্ষেত্রে ঝুঁকি ব্যাপক। ঝুঁকির সবচেয়ে সাধারণ রূপ হল ফসল কাটার আগেই কৃষি পণ্যের ক্ষতি বা নষ্ট হয়ে যাওয়া। প্রতি বছর উদ্ভিদের কীটপতঙ্গ ও রোগের কারণে বিশ্বব্যাপী ফসল উৎপাদনের ৪০ শতাংশ নষ্ট হয়। খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনাপ্রবাহের পুনরাবৃত্তি এবং তীব্রতা বিশ্ব জুড়ে বাড়ছে। এফএও ২০২৫ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কৃষিক্ষেত্রে প্রায় ৩.২৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যার মধ্যে ২০১০ সাল থেকে ক্ষতির পরিমাণ মারাত্মক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্যা, ঝড়, ভূমিকম্প, খরা, চরম তাপমাত্রা এবং দাবানল-সহ জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগের কারণে এই ক্ষতির পরিমাণ ২.৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্ব জুড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি পণ্য হল খাদ্যশস্য। বিশ্বব্যাপী ক্ষতির প্রায় ৪৭ শতাংশ এশিয়ায় ঘটে।
ভারতে ২০২৫-২৬ সালে জল-আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের কারণে ১১৭ লক্ষ হেক্টর আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল (২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের হিসেব অনুযায়ী)। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারতে ৩৩৪ দিনের মধ্যে ৩৩১ দিনই চরম আবহাওয়ার ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে। ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে আবাদি জমির ক্ষতি ন’গুণ বেড়েছে। ‘ভারতে প্রান্তিক কৃষকদের অবস্থা – ২০২৪’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি ভারতের ২১টি রাজ্য জুড়ে ৬,৬১৫ জন প্রান্তিক কৃষকের (যাঁরা এক হেক্টর পর্যন্ত জমিতে চাষ করেন) উপর পরিচালিত একটি সমীক্ষার উপর ভিত্তি করে নির্মিত। প্রায় ৮১ শতাংশ প্রান্তিক কৃষক চরম আবহাওয়া এবং জলবায়ু-সম্পর্কিত ঘটনার কারণে ফসলের ক্ষতির কথা জানিয়েছেন। খরা বা স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি অতিরিক্ত বা অসময়ের বৃষ্টিই ছিল জলবায়ু-সম্পর্কিত ফসল ক্ষতির প্রধান কারণ।
বন্যা, ঝড়, ভূমিকম্প, খরা, চরম তাপমাত্রা এবং দাবানল-সহ জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগের কারণে এই ক্ষতির পরিমাণ ২.৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।
কৃষিক্ষেত্রে ঝুঁকি মোকাবিলা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর একটি উপায় হল ঝুঁকি হস্তান্তর, যা সাধারণত কৃষি বা শস্য বিমা (এগ্রিকালচারাল অথবা ক্রপ ইনশিওরেন্স) নামে পরিচিত। শস্য বিমাকে ঝুঁকি মোকাবিলার অন্যতম কার্যকর একটি ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাপক ভাবে গণ্য করা হয়। ভারতে প্রথম শস্য বিমা প্রকল্প ১৯৭২ সালে চালু হয়েছিল। ১৯৯৯ সালে চালু হওয়া জাতীয় কৃষি বিমা প্রকল্পে এলাকাভিত্তিক এবং ব্যক্তিগত উভয় মূল্যায়নের মাধ্যমে সমস্ত কৃষককে বিমার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা (পিএমএফবিওয়াই) এবং পুনর্গঠিত আবহাওয়া-ভিত্তিক শস্য বিমা প্রকল্প (রিকনস্ট্রাকচারড ওয়েদার-বেসড ক্রপ ইনশিওরেন্স স্কিম বা আরডব্লিউবিসিআইএস) সমস্ত রাজ্যে চালু করা হয়।
২০২৫ সাল নাগাদ পিএমএফবিওয়াই এবং আরডব্লিউবিসিআইএস-এর আওতায় খরিফ শস্যের জন্য ১৫ শতাংশ এবং রবি শস্যের জন্য ১৪ শতাংশ নারী সুবিধাভোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইএফএডি-এর মতে, বিশ্ব জুড়ে কৃষিক্ষেত্রে কর্মরত বেশির ভাগ নারীর কৃষি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ব্যবস্থাই নেই। স্থিতিশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (সাস্টেনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল বা এসডিজি) ৫ — যার উদ্দেশ্য লিঙ্গ সমতা অর্জন — স্বীকার করে যে, গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতায়ন ও কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য সুরক্ষিত ভূমি অধিকার অপরিহার্য এবং এটি জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন ও স্থিতিস্থাপকতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৬ সালে প্রকাশিত সর্বশেষ কৃষিসুমারি অনুসারে, ভারতে মোট কর্মক্ষম জমির মালিকের মধ্যে ১৪ শতাংশ ছিলেন নারী। তাঁদের মধ্যে ৭২ শতাংশ প্রান্তিক শ্রেণির (১ হেক্টরের কম) এবং ১৭ শতাংশ ক্ষুদ্র কৃষক (১-২ হেক্টর) ছিলেন।
জলবায়ু পরিবর্তন মাটির অবক্ষয়, জলের অভাব, ফসলের ক্ষতি এবং ফলন হ্রাসের মাধ্যমে কৃষিকে প্রভাবিত করে। আবাদযোগ্য জমির সঙ্কোচন উৎপাদনশীল জমি নিয়ে বিরোধকে তীব্র করে তোলে, যা নারীদের জন্য তাঁদের ভূমি অধিকার লাভ করাকে ক্রমশ কঠিন করে তোলে। মরুকরণ, ভূমি অবক্ষয় এবং খরা নারী ও মেয়েদের উপর অসম এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলে। জলবায়ু ও আবহাওয়া-সম্পর্কিত ঘটনা থেকে উদ্ভূত কৃষি ঝুঁকি বাড়ছে।
কৃষিক্ষেত্রে নারীদের ক্রমবর্ধমান প্রাধান্য এবং জলবায়ু ঝুঁকি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে, ঝুঁকি প্রশমন ব্যবস্থাগুলিকে লিঙ্গ-অন্তর্ভুক্তিমূলক করা অপরিহার্য।
ভারতে নারীদের কর্মসংস্থান প্রধানত কৃষিক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত। এই খাতে প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রামীণ নারী নিযুক্ত আছেন। ভারতে মোট নারী কর্মসংস্থানের প্রায় ৬০ শতাংশই কৃষিক্ষেত্রে, যেখানে কর্মরত পুরুষের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৩৪ শতাংশ। নারীরা সমস্ত কৃষি কাজের প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পাদন করেন। ভারতে কৃষিক্ষেত্রে নারীদের প্রাধান্য বৃদ্ধি পেলেও, মাত্র ১৪ শতাংশ নারীই এই খাতের সক্রিয় মালিক। জমির দলিল না থাকায় তাঁরা শস্য বিমার জন্য অযোগ্য। জলবায়ু পরিবর্তন এবং আবহাওয়াজনিত ঘটনা কৃষিকে এবং ফলস্বরূপ এই খাতে কর্মরত নারীদের প্রভাবিত করে। কৃষিক্ষেত্রে নারীদের ক্রমবর্ধমান প্রাধান্য এবং জলবায়ু ঝুঁকি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে, ঝুঁকি প্রশমন ব্যবস্থাগুলিকে লিঙ্গ-অন্তর্ভুক্তিমূলক করা অপরিহার্য।
ভারতের ১২টি রাজ্যের ১৬,০০০ ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড থেকে প্রাপ্ত লিঙ্গ-ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০২৩ সালের একটি গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নারীবান্ধব নীতি সংশোধন সত্ত্বেও পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা এবং সাংস্কৃতিক ও সামাজিক রীতিনীতি নারীদের ভূমি মালিকানাকে ক্রমাগত সীমাবদ্ধ করে চলেছে। নারীবাদী অর্থনীতিবিদ ডঃ বীণা আগরওয়াল ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে লিখেছেন: ‘বিবাহ, বাসস্থান এবং নারীদের অন্তর্ভুক্ত না করা সংক্রান্ত প্রথাগত রীতিনীতি; পুরুষ আত্মীয়দের দ্বারা ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতা; সরকারি সংস্থাগুলির কার্যক্রমে পক্ষপাতিত্ব ইত্যাদি বিভিন্ন ভাবে নারীদের তাঁদের আইনগত অংশ দাবি করতে বা স্বাধীন কৃষক হিসেবে কাজ করতে বাধা দেয়, যদিও এই কারণগুলির প্রকৃতি ও প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়।’ ভারতের জটিল সামাজিক কাঠামো নারীদের তাঁদের ভূমি অধিকার লাভ করতে এবং ফলস্বরূপ, শস্য বিমার মাধ্যমে কৃষি ঝুঁকি কমাতে ক্রমাগত বাধা দিয়ে চলেছে।
কৃষিক্ষেত্রে কর্মরত নারীদের জন্য শস্য বিমার আওতা — যা একটি কার্যকর ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা — আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রসারিত করার উপায় খুঁজে বের করা অপরিহার্য।
পিএমএফবিওয়াই-এর কার্যপ্রণালী নির্দেশিকায় নারী কৃষকদের সর্বাধিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ প্রচেষ্টার আহ্বান জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি, এই নির্দেশিকায় ভূমি রেকর্ডের প্রামাণ্য দলিল, যেমন ভূমি দখল সনদ (এলপিসি), প্রযোজ্য চুক্তি বা সমঝোতার বিবরণ অথবা অন্যান্য বিজ্ঞাপিত নথি জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নারীদের জমির মালিকানাকে ঘিরে থাকা গভীর সামাজিক জটিলতাগুলি নিরসনের জন্য একাধিক পন্থা অবলম্বন করা প্রয়োজন এবং প্রত্যাশিত ফলাফলের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা বাস্তবসম্মত না-ও হতে পারে। তবে কৃষিক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকি এবং কৃষিতে নারীর প্রাধান্য একটি বর্তমান বাস্তবতা। এই প্রেক্ষাপটে নিম্নলিখিত বিকল্পগুলি বিবেচনা করা যেতে পারে:
১. নারী কৃষকদের তালিকাভুক্তকরণ: কৃষিক্ষেত্রে নারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ব্যাপক ভাবে স্বীকৃত। খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় নারীদের প্রায়শই উপেক্ষিত অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জ ২০২৬ সালকে আন্তর্জাতিক নারী কৃষক বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছে। জমির দলিল থাকুক বা না থাকুক, যে নারীরা কৃষক হিসেবে সক্রিয় ভাবে জমি চাষ করছেন, তাঁদের স্বীকৃতি দেওয়া এবং নথিভুক্ত করা জরুরি।
২. নিবিড় ঝুঁকি সচেতনতা প্রশিক্ষণ: অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের অন্যত্র চলে যাওয়ার কারণে কৃষিক্ষেত্রে নারীরাই প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হয়ে উঠেছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, কৃষিক্ষেত্রে নারীদের কৃষি ঝুঁকি এবং তা মোকাবিলার জন্য উপলব্ধ উপায়গুলি সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ ধারণা দেওয়া ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
৩. জমির দলিলবিহীন নারী কৃষকদের অন্তর্ভুক্তিকরণ: গ্রামীণ ভারতে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টধারীদের মধ্যে ৪২.২ শতাংশই নারী। একটি বিবেচনার যোগ্য নীতিগত বিকল্প হল, জমির দলিল নেই অথচ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে এমন স্বীকৃত নারী কৃষকদের শস্য বিমা প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা। এ ক্ষেত্রে যোগ্যতার মানদণ্ড বিকল্প বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের শর্তাধীন হতে পারে।
কৃষিক্ষেত্রে নারীর গুরুত্ব বিশ্ব জুড়ে স্বীকৃত। ভারতে নারীরা কৃষিক্ষেত্রে প্রধান কর্মশক্তি হলেও, জটিল সামাজিক কাঠামোর কারণে তাঁদের পক্ষে জমির দলিল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান চরম আবহাওয়ার ঘটনা কৃষিক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। কৃষিক্ষেত্রে কর্মরত যে নারীদের জমির দলিল নেই, তাঁরা শস্য বিমার সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন। কৃষিক্ষেত্রে কর্মরত নারীদের জন্য শস্য বিমার আওতা — যা একটি কার্যকর ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা — আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রসারিত করার উপায় খুঁজে বের করা অপরিহার্য।
মঞ্জুশ্রী ব্যানার্জি ২০০২ সাল থেকে শক্তি রূপান্তর, কৃষি অর্থনীতি এবং স্থিতিশীল উন্নয়নের ক্ষেত্রে একজন অনুশীলনকারী ও গবেষক হিসেবে কাজ করে চলেছেন।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Manjushree Banerjee is an independent researcher focusing on energy transition and agricultural economics. From 2002 to 2018, she worked with various organisations, including The Energy ...
Read More +