এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ‘ইন্দো-প্যাসিফিক ডিফেন্স ফোরাম’-এ।
ভারত মহাসাগর নিয়ে নয়াদিল্লির বহুমুখী কৌশল।
এক সময় উপেক্ষিত অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হলেও, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলটি বর্তমানে ভূ-অর্থনৈতিক সুযোগ এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দ্রুত উঠে আসছে।
যদিও এই অঞ্চলের ভিতরে ও বাইরের অনেক পক্ষ এর সঙ্গে জড়িত, তবুও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাটি মূলত চিন ও ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে মনে হয়।
ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত প্রেক্ষাপটে এই অঞ্চলটি যেমন অপরিহার্য, তেমনই এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এখানে বিশেষ সুবিধাও রয়েছে এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কিছু আবশ্যিক বিষয়ও জড়িত। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারত এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে; বিশেষ করে পছন্দের নিরাপত্তা অংশীদার বা সঙ্কট কালে দ্রুত সাড়া প্রদানকারী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়ে তারা এই অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠনে বিশেষ অবদান রাখছে।
চিন ও ভারতের পরস্পর-বিরোধী কৌশল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা এক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্ম দিয়েছে, যা নিরাপত্তা পরিস্থিতির রূপরেখা নির্ধারণ করছে।
এরই মধ্যে বৈশ্বিক মর্যাদা ও আঞ্চলিক আধিপত্য অর্জনের কৌশলের অংশ হিসেবেই যেন চিন তার উপস্থিতি জোরদার করার চেষ্টা চালাচ্ছে। চিন ও ভারতের পরস্পর-বিরোধী কৌশল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা এক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্ম দিয়েছে, যা নিরাপত্তা পরিস্থিতির রূপরেখা নির্ধারণ করছে।
নয়াদিল্লি ও বেজিংয়ের ক্রম-পরিবর্তনশীল কৌশলই এই প্রতিযোগিতার মূল ভিত্তি। ভারতের জন্য চিনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি তার সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে; বেজিংয়ের এই অগ্রযাত্রা এক ধরনের নিরাপত্তা সঙ্কট বা দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি করেছে। এর জবাবে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও প্রস্তুতির সক্ষমতা বাড়াতে নয়াদিল্লি সুপরিকল্পিত ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক, নৌ ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
চিনের অগ্রযাত্রা
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চিনের কর্মকাণ্ড সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র ও নানাবিধ চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে — যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে পূর্ব চিন সাগর, দক্ষিণ চিন সাগর ও তাইওয়ান প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ — চিনের সংঘাতপূর্ণ আচরণ মূলত তাদের নিজস্ব কোস্ট গার্ড এবং অন্যান্য দেশের কোস্ট গার্ডের মধ্যে ছোটখাটো সংঘর্ষের জন্ম দেয়। দক্ষিণ চিন সাগরে আইনানুগভাবে চলাচলকারী ফিলিপিন্সের নৌযানগুলির প্রতি চিনের অব্যাহত উসকানি এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
এর বিপরীতে, ভারত মহাসাগরে বেজিংয়ের তৎপরতা অনেক বেশি সুপরিকল্পিত ও কৌশলী বলে মনে হয়, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই ইঙ্গিত দেয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, চিন কোনও ভারত মহাসাগরীয় শক্তি নয়; ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে এই অঞ্চলটি বেজিংয়ের জন্য কোনও স্বাভাবিক কৌশলগত ‘ব্যাকইয়ার্ড’ বা নিজস্ব প্রভাব বলয় নয়। এই বাস্তবতা কাটিয়ে উঠতে বেজিং বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করেছে: এক দিকে উন্নয়নমূলক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলির মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করছে, অন্য দিকে সামরিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য ‘দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য’ (সামরিক ও বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হতে সক্ষম) সমীক্ষা সংক্রান্ত জাহাজ মোতায়েন করছে।
২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে ভারত মহাসাগরে চিনের নৌ-তৎপরতা শুরু হয়; তখন দাবি করা হয়েছিল যে পূর্ব আফ্রিকার সোমালিয়া উপকূলে জলদস্যুতার প্রকোপ বৃদ্ধির জবাবেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। তবে ২০১৩ সালে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি বা সাধারণ সম্পাদক শি জিনপিং যখন তাঁর ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ (ওবিওআর) অবকাঠামো প্রকল্প ঘোষণা করেন, তখন থেকেই বেজিং এই অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি আরও সুদৃঢ় করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে ভারত মহাসাগরে চিনের নৌ-তৎপরতা শুরু হয়; তখন দাবি করা হয়েছিল যে পূর্ব আফ্রিকার সোমালিয়া উপকূলে জলদস্যুতার প্রকোপ বৃদ্ধির জবাবেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে।
‘ওবিওআর’-এর আওতায় চিন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ, আর্থিক সহায়তা প্রদান (যার মধ্যে প্রায়শই ‘শোষণমূলক ঋণ’ বা ‘প্রেডেটরি লেন্ডিং’-এর বিষয়টি জড়িত থাকে) এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার মাধ্যমে ভারত মহাসাগরীয় উপকূলবর্তী দেশগুলির সঙ্গে নিজেদের অংশীদারিত্ব জোরদার করেছে।
এ ছাড়া ‘চিন-ভারত মহাসাগরীয় ফোরাম’-এর মাধ্যমেও চিন নিজেকে একটি নেতৃস্থানীয় শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে; ২০২২ সালে শুরু হওয়া এই বার্ষিক ফোরামটি মূলত সামুদ্রিক আঞ্চলিকতাকে উৎসাহিত করার একটি উদ্যোগ।
এর পাশাপাশি, চিন এমন সব সমীক্ষা সংক্রান্ত জাহাজ মোতায়েন করেছে, যা প্রায়শই ভারতের নিকটবর্তী দেশ — যেমন মলদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার বন্দরে নোঙর করে থাকে। যদিও চিন দাবি করে যে, এই জাহাজগুলি জললেখচিত্র সংক্রান্ত বা হাইড্রোগ্রাফিক সমীক্ষা চালাচ্ছে, তবুও বিশ্লেষকদের মতে, জাহাজগুলি আসলে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) সামরিক বাহিনীর হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির কাজও করতে পারে।
ভারতের পাল্টা কৌশল
চিনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে, ভারত তার কৌশলগত সম্পৃক্ততা জোরদার করেছে এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে নিজের কেন্দ্রীয় ভূমিকার উপর গুরুত্বারোপ অব্যাহত রেখেছে। অন্যান্য উদ্যোগের পাশাপাশি, নয়াদিল্লি বহুমুখী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা, ভারতীয় নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ করছে।
চিনের ‘পারস্পরিক সুবিধা-ভিত্তিক লেনদেন’ বা ‘কুইড প্রো কো’ মডেলের মোকাবিলায় ভারত নিজেকে একটি ‘পছন্দসই নিরাপত্তা অংশীদার’ বা ‘প্রথম সাড়াদানকারী’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। বেজিং সাধারণত তাদের নির্মিত অবকাঠামোর উপর আংশিক বা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে চিনা কর্মী ব্যবহারের মতো শর্ত আরোপ করে থাকে। কিন্তু ভারত তার নিজস্ব উদ্যোগ ও আলোচনার ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিস্থিতি বা পদ্ধতি এড়িয়ে চলতে সতর্ক রয়েছে। কেবল সেবাদাতা বা সহায়তাকারী না হয়ে বরং প্রকৃত অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার মাধ্যমে ভারত ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে চিনের কর্মপদ্ধতি থেকে নিজের অবস্থানকে আলাদা করেছে।
‘ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন’-এর মাধ্যমে আঞ্চলিক দেশগুলির সঙ্গে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে ভারত আঞ্চলিক সচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নতুন গতি সঞ্চার করছে। এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল, যা এই বিষয়টিকেই জোরালো ভাবে তুলে ধরে যে, চিন কোনও ভারত মহাসাগরীয় শক্তি নয়, এবং এই অঞ্চলে তাদের কোনও স্বাভাবিক বা সহজাত স্বার্থও নেই।
একই সঙ্গে ভারত তার নৌবহর সম্প্রসারণসহ দেশীয় উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নতুন গতি সঞ্চার করেছে। পারমাণবিক শক্তিচালিত ব্যালিস্টিক মিসাইল সাবমেরিন এবং স্টিলথ ফ্রিগেটের মাধ্যমে ভারত তার প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদার করে চলেছে। পাশাপাশি, দেশটি নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন নতুন দিক উন্মোচনেও তৎপর। এর একটি উদাহরণ হল ভারতীয় নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বহুজাতিক ‘ইনফরমেশন ফিউশন সেন্টার – ইন্ডিয়ান ওশান রিজিয়ন’-এর মাধ্যমে সামুদ্রিক পরিস্থিতি বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি।
ভবিষ্যৎ সুরক্ষাব্যবস্থা
এই অঞ্চলে চিনের অগ্রযাত্রা রোধে ভারত নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করে চলেছে। এর লক্ষ্য হল নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলা, যা ভারতের অনুকূলে থাকে। চিনের উপস্থিতির কারণে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জগুলি বেশ জটিল। ভারতের কৌশলগত প্রভাব বলয়ে বেজিংয়ের অনুপ্রবেশ মোকাবিলায় ভারত যে বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করেছে, তার মূলে রয়েছে তিনটি প্রধান দিক: ভারত মহাসাগরীয় উপকূলবর্তী দেশগুলির সঙ্গে নয়াদিল্লির অংশীদারিত্বের প্রকৃতি স্পষ্ট ভাবে সংজ্ঞায়িত করা; আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং নৌ-সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
এই প্রতিবেদনটি সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ‘ইন্দো-প্যাসিফিক ডিফেন্স ফোরাম’-এ।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.
Professor Harsh V. Pant is Vice President at Observer Research Foundation, New Delhi. He is a Professor of International Relations with King's India Institute at ...
Read More +
Sayantan Haldar is an Associate Fellow with ORF’s Strategic Studies Programme. At ORF, Sayantan’s work is focused on Maritime Studies. He is interested in questions on ...
Read More +