অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন গোটা দেশকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, সুশাসন সংবেদনশীল হবে। আর সরকার বাস্তবে কান পেতে রাখার পাশাপাশি জনগণের প্রয়োজন বুঝতে সক্ষম হবে… অন্তত এমনটাই হওয়া উচিত। জনকল্যাণের ভিত্তি মজবুতকারী এ হেন নীতির জন্য নাগরিকরা সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন। আর এই প্রত্যাশা স্বাস্থ্যসেবার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সহজলভ্যতা ও ক্রয়ক্ষমতা লক্ষ লক্ষ মানুষের কল্যাণ সাধন করে।
স্বাস্থ্য বাজেটে বরাদ্দ ও বিনিয়োগ
ভারতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় গত দশকে ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধির সাক্ষী থাকলেও জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিতে (২০১৭) এই সুপারিশের অভাব অব্যাহত থেকেছে যে, জনস্বাস্থ্য ব্যয় মোট দেশীয় পণ্যের (জিডিপি) ২.৫ শতাংশ হওয়া উচিত। ২০২৫ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট এই লক্ষ্য ও স্বাস্থ্যখাতের বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল এবং বিশেষজ্ঞরা ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বর্তমান স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ে বরাদ্দ বৃদ্ধির কথা বলেছেন। জনস্বাস্থ্য প্রতিনিধিরা তামাক ও চিনিযুক্ত পণ্যের উপর ৩৫ শতাংশ জিএসটি-সহ (গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স বা পণ্য ও পরিষেবা কর) একটি উত্সর্গীকৃত স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত করের জন্য চাপ দিয়েছিলেন। তবে তা এই বছরের বাজেটে স্থান পায়নি।
২০২৫ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট এই লক্ষ্য ও স্বাস্থ্যখাতের বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল এবং বিশেষজ্ঞরা ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বর্তমান স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ে বরাদ্দ বৃদ্ধির কথা বলেছেন।
সরকার অর্থবর্ষ২৬-এর জন্য স্বাস্থ্যসেবা খাতে ৯৫,৯৫৭.৮৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, যা অর্থবর্ষ২৫ বাজেটের আনুমানিক ৯.৪৬ শতাংশ বেশি। পরিসংখ্যানটি এই খাতে ক্রমাগত বিনিয়োগের ইঙ্গিত দিলেও এটি জনস্বাস্থ্য অবকাঠামোতে দীর্ঘস্থায়ী সম্পদের ব্যবধানকে মোকাবিলা করতে পারেনি। এ বছর স্বাস্থ্যসেবা খাতে মোট বাজেটের ১.৯৪ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় হ্রাসের প্রবণতাকেই দর্শায়। ২০১৭ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা বরাদ্দ ক্রমাগত ভাবে মোট বাজেটের ২ শতাংশের উপরেই ছিল এবং কোভিড-১৯-এর বছর ছাড়া জরুরি খাতে ব্যয় সাময়িক ভাবে এই বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধিই করেছিল। যাই হোক, গত দু’বছর ধরে এই অনুপাত হ্রাস পেয়েছে এবং তা অবশ্যই উদ্বেগ বৃদ্ধি করেছে।
সর্বোপরি, বরাদ্দ কাঠামো এনএইচপি ২০১৭ থেকে বিচ্ছিন্নই থাকছে, যেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য স্বাস্থ্য বাজেটের দুই-তৃতীয়াংশ বরাদ্দ করার কথা ছিল। পরিবর্তে, ন্যাশনাল হেলথ মিশন-এর (এনএইচএম) ক্ষেত্রে গত পাঁচ বছরে সামগ্রিক স্বাস্থ্য বাজেটের মধ্যে এই অনুপাত প্রায় ৪০ শতাংশ*-এ রয়ে গিয়েছে। এই পরিবর্তনটি প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করার চেয়ে এআইআইএমএস-এর মতো তৃতীয় পরিচর্যায় বিনিয়োগের জন্য একটি অগ্রাধিকারকেই দর্শায়। এটি এমন একটি প্রবণতা, যা বিশ্বব্যাপী সর্বোত্তম অনুশীলনের বিরোধিতাকারী।
বরাদ্দ কাঠামো এনএইচপি ২০১৭ থেকে বিচ্ছিন্নই থাকছে, যেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য স্বাস্থ্য বাজেটের দুই-তৃতীয়াংশ বরাদ্দ করার কথা ছিল।
আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা (এবি পিএম-জেএওয়াই) প্রকল্পে ৯৪০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই খাতে গত বছরের বাজেট থেকে প্রায় ২৯ শতাংশ বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। অন্য দিকে প্রধানমন্ত্রী আয়ুষ্মান ভারত হেলথ ইনফ্রাস্ট্রাকচার মিশন (পিএমএবিএইচআইএম) খাতে আগের বছরের তুলনায় ৪২০০ শতাংশ বৃদ্ধি লক্ষ করা গিয়েছে। এই বৃদ্ধিগুলি পিএমজেএওয়াই-এর সাম্প্রতিক সম্প্রসারণকেই দর্শায়, যাতে সমস্ত সত্তরোর্ধ্ব মানুষজন ও তৃতীয় পরিকাঠামোর উপর আরও বেশি করে মনোযোগ দেওয়া যায়।
সারণি ১: স্বাস্থ্য বিভাগের বাজেটের শতাংশ হিসাবে পিএমজেএওয়াই এবং পিএমএবিএইচআইএম-এ বরাদ্দ, বাজেট নথি (১), (২), (৩) এবং (৪) থেকে গৃহীত
বছর
|
পিএমজেএওয়াই খাতে বরাদ্দ (কোটি টাকায়)
|
সমগ্র স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে বরাদ্দ (কোটি টাকায়)
|
পিএমজেএওয়াই-এর আনুপাতিক শতাংশ
|
পিএমএবিএইচআইএম খাতে বরাদ্দ (কোটি টাকায়)
|
পিএমএবিএইচআইএম-এর আনুপাতিক শতাংশ
|
২০২১-২২
|
৬৪০০
|
৭১,২৬৮.৭৭
|
৮.৯৮
|
-
|
|
২০২২-২৩
|
৬৪১২
|
৮৩,০০০
|
৭.৭২
|
৪১৭৬.৮৪
|
৫.০৩
|
২০২৩-২৪
|
৭২০০
|
৮৬,১৭৫
|
৮.৩৫
|
৪২০০
|
৪.৮৭
|
২০২৪-২৫
|
৭৩০০
|
৮৭,৬৫৬.৯০
|
৮.৩২
|
৩২০০
|
৩.৬৫
|
২০২৫-২৬
|
৯৪০৬
|
৯৫,৯৫৭.৬৭
|
১৪.২৬
|
৪২০০
|
৪.৩৭
|
যে যে বিষয়ের উপর নজর দেওয়া হয়নি তার মধ্যে অন্যতন হল, সমস্ত স্বাস্থ্যসেবা পণ্য ও পরিষেবাগুলিতে সমন্বিত ৫ শতাংশ জিএসটি করার বিষয়ে চাপ দেওয়া। কারণ বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দিয়েছিলেন, এমনটা করা সম্ভব হলে হাসপাতাল ও চিকিৎসা প্রদানকারীদের জন্য খরচ হ্রাস পেতে পারে। বরং অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসা পণ্যগুলিতে খণ্ডিত কর কাঠামো ও উচ্চ জিএসটি হার একটি বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে।
স্বাস্থ্য বিমা ও আর্থিক প্রণোদনা
ক্রমবর্ধমান খরচ সত্ত্বেও ভারতে বিমায় মানুষের অর্থপ্রদান বিশেষ করে ‘মিসিং-মিডল’ (মধ্যবিত্ত পরিবার) এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের মধ্যে বেশ কম। প্রত্যাশা করা হয়েছিল যে, স্বাস্থ্য বিমার প্রিমিয়ামের উপর যদি জিএসটি ১৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে আনা যায়, তা হলে তা এটি স্বাগত পদক্ষেপ হতে পারে। কারণ এর দরুন নীতিগুলি আরও সাশ্রয়ী ও সম্প্রসারিত হতে পারত। একই ভাবে, ধারা ৮০ডি-র অধীনে কর কাটার সীমা ২৫০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০০০ টাকা করলে তা আসলে ব্যক্তিদের নিজেদের স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ করার জন্য আরও প্রণোদনা জোগাবে বলে মনে করা হয়েছিল। তবে বাজেটে এ সব দাবির কোনও সুরাহা হয়নি।
চিত্র ১: স্বাস্থ্য বিমা ও আর্থিক প্রণোদনা, (১), (২), (৩) এবং (৪) থেকে লেখক দ্বারা সঙ্কলিত
১) এক কোটি অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের স্বাস্থ্য বিমা – এই বাজেটে অনানুষ্ঠানিক ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা কভারেজ প্রদানের ক্ষেত্রে এক নতুন উদ্যোগের কথা ঘোষণা করা হয়েছে, যা আর্থিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবধান দূর করে।
২) বয়স্ক নাগরিকদের সুবিধা – ভারতের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার পেনশন নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য পরিষেবায় সহায়তা বৃদ্ধির জন্য নীতি পদক্ষেপ আশা করা হলেও তা প্রধানত অনুপস্থিতই থেকেছে।
৩) ইএসআইসি তহবিলের ব্যবহার – বিমাকৃত কর্মীদের স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার সুবিধা উন্নত করার জন্য খরচ হয়নি এ হেন এমপ্লয়ি স্টেট ইনশিওরেন্স কর্পোরেশন (ইএসআইএসি) তহবিল অন্য খাতে চালনা করার প্রস্তাবটির কথা বলা হয়নি।
৪) স্বাস্থ্যবিমায় জিএসটি ছাড় – শিল্প সম্প্রদায়ের তরফে স্বাস্থ্যবিমার উপর বরাদ্দকৃত জিএসটি-র হার ১৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে পাঁচ শতাংশ করার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে বিমাকে আরও সাশ্রয়ী করে তোলা যায়। কিন্তু এই চাহিদা পূরণ করা হয়নি।
|
কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৫-এর আয়করের ছাড়ের মাত্রা বার্ষিক সাত লক্ষ টাকা থেকে কমবেশি ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করার ফলে ডিসপোজেবল আয় বাড়বে বলে আশা করা যেতে পারে, যা বিমা ক্রয়ের হার বৃদ্ধি করতে পারে। বাজেট স্বাস্থ্য বিমার স্থিতাবস্থা বজায় রাখলেও এ ক্ষেত্রে এমন সংস্কার প্রবর্তনের সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে, যা উল্লেখযোগ্য ভাবে ক্রয়ক্ষমতার উন্নতি করতে পারত।
চিত্র ১-এ নিবিড় নজর দিলে দেখা যাবে, এই বছরের বাজেট থেকে জিএসটি ত্রাণ, পুনঃনির্দেশিত ইএসআইসি তহবিল, পেনশন স্কিম সমন্বিতকরণ এবং জীবন বিমা বার্ষিকীতে কর কর্তন-সহ মূল প্রত্যাশাগুলি তুলে ধরা হলেও বেশির ভাগ বিষয়ের কথা অধরাই রয়ে গিয়েছে।
স্বাস্থ্য অবকাঠামো, চিকিৎসা শিক্ষা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যকে সশক্ত করা
কোভিড-১৯ অতিমারি স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর দীর্ঘস্থায়ী ব্যবধানগুলিকে প্রকট করেছে, যা হাসপাতালের ক্ষমতা, শয্যা, রোগীর উপর নজরদারি ও কর্মীদের সম্প্রসারণে বিনিয়োগের জন্য জরুরি প্রয়োজন তৈরি করেছে। জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন (এনএইচএম) খাতে রোগীর উপর নজরদারি, উন্নত পরীক্ষার সুবিধা ও জরুরি প্রস্তুতির উন্নতির জন্য ৩৭,২২৬.৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। যাই হোক, এনএইচএম যেহেতু সরকারের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প, তাই এ ক্ষেত্রে কোনও বড় বাজেট বরাদ্দ ছাড়াই মূলত স্থিতাবস্থা লক্ষ করা যায়।
সারণি ২: স্বাস্থ্য বিভাগের বাজেটের শতাংশ হিসাবে এনএইচএম খাতে বরাদ্দ, বাজেট নথি (১), (২) এবং (৩) থেকে গৃহীত
বছর
|
এনএইচএম বাজেট (কোটি টাকায়)
|
সমগ্র স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে বরাদ্দ (কোটি টাকায়)
|
আনুপাতিক শতাংশ
|
২০২১-২২
|
৩৬,৬৭৫.৫০
|
৭১,২৬৮.৭৭
|
৫১.৩২
|
২০২২-২৩
|
২৮,৮৫৯.৭৩
|
৮৩,০০০
|
৩৪.৭৭
|
২০২৩-২৪
|
২৯,০৮৫.২৬
|
৮৬,১৭৫
|
৩৩.৭৫
|
২০২৪-২৫
|
৩৬,০০০
|
৮৭,৬৫৬.৯০
|
৪১.০৬
|
২০২৫-২৬
|
৩৭,২২৬.৩৭
|
৯৫,৯৫৭.৮৭
|
৩৮.৭৯
|
এই বাজেটে আর একটি বড় ঘোষণা ছিল আগামী তিন বছরে জেলা হাসপাতালে ডে-কেয়ার ক্যানসার কেন্দ্রের পাশাপাশি অর্থবর্ষ২৬-এ ২০০টি ক্যানসার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা, যা ক্যানসার সংক্রান্ত যত্ন প্রদানে একটি বড় ব্যবধান পূরণে সহায়ক বলে প্রমাণিত হতে পারে।
আগামী বছরে ১০,০০০ অতিরিক্ত মেডিকেল আসন যোগ করার পরিকল্পনার পাশাপাশি মেডিকেল শিক্ষা ক্ষেত্রও একটি উল্লেখযোগ্য প্রণোদনার সাক্ষী হয়েছে, যেখানে আগামী পাঁচ বছরে ৭৫০০০ আসন যোগ করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বাজেটে আরও বেশি পরিমাণ চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করা নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত এক দশকে ১.১ লক্ষ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর আসন যোগ করা হয়েছে, যা ১৩০ শতাংশ বৃদ্ধিকেই দর্শায়। যাই হোক, প্রত্যাশা থাকা সত্ত্বেও টিয়ার-২ ও টিয়ার-৩ শহরে চিকিৎসা শিক্ষার উন্নতির জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি), ছাত্রদের সহায়তার জন্য বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা বা চিকিৎসা শিক্ষাবিদদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে একটি কাঠামোগত ফ্যাকাল্টি পুল বা শিক্ষকদের গোষ্ঠী তৈরির বিষয়ে কোনও বড় ঘোষণা হয়নি।
বাজেটে ‘হিল ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির অধীনে উদ্যোগের রূপরেখাও দেওয়া হয়েছে। পর্যটনের জন্য ২০,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক রোগীদের দ্রুত প্রবেশের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি বেসরকারি ক্ষেত্রের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার মতো বিষয়গুলি। বিশেষজ্ঞরা কর প্রণোদনা-সহ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (এসইজেড) আদলে বিশেষ মেডিকেল ট্যুরিজম জোন বা চিকিৎসা পর্যটক অঞ্চল গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে আশা করা যায়, কোনও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের রূপরেখা না থাকায় ভবিষ্যতে নীতিগত পদক্ষেপগুলি এই বিষয়টির সমাধান করতে পারে।
ওষুধ ও চিকিৎসা-প্রযুক্তি শিল্প: একটি মিশ্র ঘরানা
কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৫-এ বেসিক কাস্টমস ডিউটি (বিসিডি) থেকে ৩৬টি জীবনদায়ী ওষুধকে অব্যাহতি দিয়ে এবং ৩৭টি নতুন ওষুধ ও ১৩টি রোগী সহায়তা কর্মসূচি যুক্ত করে ক্রয়ক্ষমতা ও ব্যবহার সংক্রান্ত সমস্যা মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দেশীয় উত্পাদনকে শক্তিশালী করার জন্য ওষুধের ক্ষেত্রে প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ (পিএলআই) প্রকল্পে ২৪৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা এপিআই (অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট) এবং চিকিৎসা-প্রযুক্তি উৎপাদনে স্বনির্ভরতার জন্য সরকারের অব্যাহত প্রচেষ্টাকেই দর্শায়। যাই হোক, শিল্পের অংশীদাররা ওষুধ আবিষ্কারকে ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে আরঅ্যান্ডডি-র জন্য কর ছাড়-সহ বৃহত্তর আর্থিক প্রণোদনার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যা বাজেটে অনুপস্থিত থেকেছে। চিত্র ২-এ দেখানো হয়েছে, আরঅ্যান্ডডি খাতে উল্লেখযোগ্য প্রণোদনা ও নিয়ন্ত্রক সংস্কারের প্রত্যাশা অপূর্ণ থেকে গিয়েছে। ভারতের ওষুধের রফতানি বাড়ানোর জন্য শিল্প নেতারা উচ্চতর আরওডিটিইপি-র (রফতানিকৃত পণ্যের উপর শুল্ক ও কর ছাড়) প্রণোদনার আশা করেছিলেন।
চিত্র ২: ওষুধ ও চিকিৎসা-প্রযুক্তি, (ক), (খ), (গ), (ঘ) এবং (ঙ) থেকে সঙ্কলিত
১) ৩৬টি জীবনদায়ী ওষুধকে বেসিক কাস্টমস ডিউটি (বিসিডি) থেকে সম্পূর্ণ ছাড় দেওয়া হয়েছে এবং অন্য আরও ৬টি ওষুধের উপর বর্তমানে অতিরিক্ত কর শুল্কে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
২) ৩৭টি নতুন ওষুধ ও ১৩টি রোগী সহায়তা কর্মসূচিকে ছাড়ের আওতায় আনা হয়েছে।
৩) ওষুধ ও চিকিৎসা-প্রযুক্তি উৎপাদনকে সশক্ত করার জন্য প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ (পিএলআই) প্রকল্পে ২৪৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
৪) ওষুধ সংক্রান্ত গবেষণা ও উন্নয়ন এবং বুদ্ধিবৃত্তিজনিত সম্পদ সুরক্ষাকে উৎসাহিত করার জন্য শিল্পগোষ্ঠীগুলির তরফে এক্সপ্যান্ডেড পেটেন্ট বক্স রেজিমের কথা বলা হলেও তা অনুপস্থিত থেকেছে।
৫) শিল্পমহলের তরফে ক্যানসার চিকিৎসা সাধনী এবং অন্য উচ্চ খরচসম্পন্ন চিকিৎসা প্রযুক্তিগুলির উপর কম শুল্কের দাবি জানানো হলেও তা পূরণ করা হয়নি।
৬) শিল্পক্ষেত্রের অগ্রণী ব্যক্তিরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি করতে উচ্চ আরওডিটিইপি (রেমিশন অফ ডিউটিজ অ্যান্ড ট্যাক্সেস অন এক্সপোর্টেড প্রোডাক্টস) প্রণোদনার পক্ষে সওয়াল করেছেন।
|
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা
নিরাময়মূলক স্বাস্থ্যসেবা প্রায়শই বাজেট আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও জনস্বাস্থ্যের ফলাফলের উন্নতির জন্য প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা সবচেয়ে সাশ্রয়ী কৌশলই থেকেছে। ২০২৫ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে প্রতিরোধমূলক যত্নের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে ক্যানসার চিকিৎসার পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে। যাই হোক, টিকাদান কর্মসূচির মতো ক্ষেত্রগুলিতে মূল ব্যবধান রয়েই গিয়েছে। চিত্র ৩-এ প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মূল প্রত্যাশা এবং ব্যবধানগুলির কথা তুলে ধরা হয়েছে।
চিত্র ৩: প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, (১), (২) এবং (৩) থেকে সঙ্কলিত
১) মানসিক স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ – ন্যাশনাল টেলিমেন্টাল হেলথ প্রোগ্রামে ৭৯.৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলেও বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দিয়েছেন যে, গ্রামীণ মানসিক স্বাস্থ্য উদ্যোগের জন্য আরও শক্তিশালী প্রণোদনা করার, বিশেষ করে উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে।
২) গবেষণা ও উন্নয়নকে সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত সেন্টার অফ এক্সিলেন্সগুলির নিরিখে বর্ধিত তহবিলের কথা ঘোষণা করা হলেও এআই ব্যবহারকারী চিকিৎসা-প্রযুক্তি স্টার্ট-আপগুলির জন্য অতিরিক্ত প্রণোদনার কথা বলা হয়নি।
৩) বহু প্রত্যাশিত বৃহৎ মাত্রায় এইচপিভি (হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস) টিকা কর্মসূচি এবং সার্ভাইক্যাল ক্যানসার সংক্রান্ত নিরীক্ষণমূলক উদ্যোগগুলির প্রসারের কথা বাজেটে অনুপস্থিত থেকেছে।
৪) গ্লোবাল কেপেবিলিটি সেন্টার (জিসিসি) – সরকারের তরফে টিয়ার-২ শহরগুলিতে জিসিসি-র প্রচারের জন্য এক জাতীয় অবকাঠামোর কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এটির লক্ষ্য হল অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রতিভার লভ্যতা উন্নত করা এবং একটি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা-প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে ভারতের অবস্থানকে সশক্ত করা।
|
স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত জিএসটি ও কর সংস্কার
শিল্পের অংশীদাররা এক সামগ্রিক সংস্কারের জন্য দাবি জানিয়েছিলেন। আরঅ্যান্ডডি-কে সশক্ত করা জন্য সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা, জিএসটি কাঠামোকে সমন্বিত করা এবং স্বাস্থ্যসেবা বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে প্রসারিত আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। তাঁদের একটি মূল দাবি ছিল, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পণ্যের উপর জিএসটি হারের যৌক্তিকতা এবং সরবরাহকারী ও রোগী উভয়ের জন্যই ক্রয়ক্ষমতা নিশ্চিত করা। চিত্র ৪-এ এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্প চাহিদাগুলি এবং রাজস্ব ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরা হয়েছে।
চিত্র ৪: জিএসটি ও কর সংস্কার, (১), (২) এবং (৩) থেকে সঙ্কলিত
১) আরঅ্যান্ডডি বা গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে প্রণোদনা – ন্যাশনাল রিসার্চ ফান্ডের অন্ততপক্ষে ১০% জীববিজ্ঞান শাখায় বরাদ্দ করার জন্য আবেদন করা হয়েছে।
২) জিএসটি-র যৌক্তিকতা – শিল্পমহলের তরফে চিকিৎসা সরঞ্জামের উপর একটি সর্বজনীন ৫-১২% জিএসটি সীমার দাবি জানানো হয়েছে।
৩) হ্রাসকৃত করের বোঝা – এই বাজেটে জিএসটি এবং অঙ্কোলজি রেডিয়েশন সাধনী, রোগ নির্ণায়ক যন্ত্রপাতি ও গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতাল সংক্রান্ত পণ্যগুলির উপর শুল্ক হ্রাস করার আবেদন জানানো হয়েছে। এগুলির মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই প্রায় ৩৭% উচ্চ হারে শুল্ক নেওয়া হয়, যা ক্যানসার পরিষেবার মতো চিকিৎসাকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল করে তোলে।
৪) দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প – স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্রে অংশীদাররা কম সুদের হার-সহ ১৫ থেকে ২০ বছরের জন্য অর্থায়নের বিকল্পগুলির উপর জোর দিয়েছেন, যাতে হাসপাতালের মূলধনের অভাবের মোকাবিলা করা যায় এবং বিশেষ করে কম পরিষেবাসম্পন্ন ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রসারকে উৎসাহিত করা যায়।
৫) স্বাস্থ্য পরিষেবা অবকাঠামোর জন্য বিনিয়োগ প্রণোদনা – অবকাঠামোকে উজ্জীবিত করার জন্য সহযোগী স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে কর ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
৬) চিকিৎসা-প্রযুক্তি ক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তরকে উৎসাহিত করা – এই বাজেটে চিকিৎসা-প্রযুক্তি বা মেডটেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তরের সঙ্গে সম্পৃক্ত সংস্থাগুলির জন্য কর কর্তন এবং পছন্দমাফিক করের হারের সূচনা করা হবে বলে আশা করা হয়েছিল। এর পাশাপাশি চিকিৎসা উদ্ভাবনী ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলির জন্য কম সুদে ঋণের বিষয়টি নিয়েও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
|
সামনের পথ
কেন্দ্রীয় বাজেট স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষ করে কর ছাড়, অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রের কর্মীদের দেখভাল এবং ক্যানসারের যত্নের জন্য খেয়াল রাখা হলেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবধান রয়েই গিয়েছে। আশ্চর্যজনক ভাবে, বাজেটে আসন্ন জনতাত্ত্বিক সঙ্কট এবং বাসস্থান, অ্যাম্বুলেটরি সেবা ও বয়স্কদের পরিষবা ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে কিছু বলাই হয়নি। এই উভয় প্রেক্ষিতই বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে চলা জনসংখ্যা ও পরিবর্তনশীল রোগের ভারের বিষয়টি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তহবিল, কর ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রক প্রণোদনার ক্ষেত্রে গভীর কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া ভবিষ্যতের নীতিগুলিকে এই ব্যবধানগুলি পূরণ করতে আরও আগ্রাসী পন্থা অবলম্বন করতে হবে।
কে এস উপলব্ধ গোপাল অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের হেলথ ইনিশিয়েটিভ-এর অ্যাসোসিয়েট ফেলো।
*বাজেট নথি থেকে লেখক দ্বারা সঙ্কলিত
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.