Published on Mar 10, 2025 Updated 0 Hours ago

সুদানের সঙ্কট শক্তিশালী সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা এবং বিদেশি শক্তি ও সুবিধাবাদী নেতাদের যোগসাজশের দরুন ক্ষতি হওয়া একটি দুর্বল রাষ্ট্রের ছবিই তুলে ধরে।

সুদানের লড়াই: খণ্ডিত ও দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস

২০২৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিবিদ ড্যারন অ্যাসেমোগ্লু, সাইমন জনসন এবং জেমস এ. রবিনসন কী ভাবে প্রতিষ্ঠানগুলি একটি দেশের সমৃদ্ধি গঠন করে সেই বিষয়ের উপর গবেষণা করে সম্মানিত হয়েছেন। তাঁদের গবেষণায় দেশ জুড়ে প্রাতিষ্ঠানিক গুণমান এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক উন্নয়নের উপর ঔপনিবেশিকতার প্রভাবের মূল্যায়ন করা হয়েছে। কয়েক দশকের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে এই তিন অর্থনীতিবিদ যুক্তি দিয়েছিলেন যে, সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সম্পদ বা ভূগোলের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলিই হল মূল কারণ, যা আসলে ব্যাখ্যা করে, কেন কিছু দেশ উন্নতি সাধন করে এবং বাকি দেশকে লড়াই করতে হয়। প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি বা দুর্বলতা কী ভাবে একটি দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে, তার একটি প্রধান উদাহরণ হয়ে উঠেছে সুদান।

সুদানের সঙ্কট

২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল দুই সামরিক নেতার মধ্যে সুদানে একটি সহিংস লড়াই শুরু হয় এবং এই দুই নেতা হলেন সুদানের নিয়মিত সামরিক বাহিনীর কম্যান্ডার জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং আধাসামরিক গোষ্ঠীর নেতা জেনারেল মুহাম্মদ হামদান দাগালো। ২০ মাস পরে ২০২৪ সালের শেষের দিকে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে থাকা যুদ্ধের দরুন ৬২,০০০ জনেরও বেশি মৃত্যু হয়েছে এবং ১৪ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে

তবে সুদানে অভ্যুত্থান বা গৃহযুদ্ধ এই প্রথম হয়নিগত সাত দশকের ইতিহাসে দেশটি প্রায় ২০টি অভ্যুত্থানমূলক প্রচেষ্টার সাক্ষী হয়েছে এবং এই অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টার নিরিখে বলিভিয়ার পরেই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সুদান এমনিতে সুদানে দুটি গৃহযুদ্ধও হয়েছে এবং তার সর্বশেষটি হয় ২০১১ সালে, যার ফলে আফ্রিকার নতুন দেশ দক্ষিণ সুদান তৈরি হয়েছিল।

ঔপনিবেশিক কার্টোগ্রাফি বা মানচিত্রায়ণে জাতিগত বা উপজাতীয় ঘনিষ্ঠতার কথা বিবেচনা না করেই সীমানা আঁকা হয় এবং ঔপনিবেশিক শাসন - যেখানে নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীকে দেশ পরিচালনার জন্য অন্যদের চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় - একটি দীর্ঘস্থায়ী জাতিগত সাম্প্রদায়িক  বিভাজন তৈরি করে।

সুদানের এই সঙ্কট তার ইতিহাস থেকে উদ্ভূত হয়েছে। ঔপনিবেশিক কার্টোগ্রাফি বা মানচিত্রায়ণে জাতিগত বা উপজাতীয় ঘনিষ্ঠতার কথা বিবেচনা না করেই সীমানা আঁকা হয় এবং ঔপনিবেশিক শাসন - যেখানে নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীকে দেশ পরিচালনার জন্য অন্যদের চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় - একটি দীর্ঘস্থায়ী জাতিগত সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করে।

ঔপনিবেশিক আমলে সুদানে ব্রিটিশরা সুদানের আমলাতন্ত্র সামরিক ব্যবস্থায় খার্তুমের চাইতেও রিভারাইন আরবদের পছন্দ করেছিল এবং দারফুর দক্ষিণ সুদানের মতো অন্যান্য অংশ এড়িয়ে গিয়েছিল, যেখানে আফ্রিকান এবং অ্যানিমিস্ট উপজাতিদের (সর্বপ্রাণবাদী অর্থাৎ যাঁরা বিশ্বাস করেন, সব প্রাকৃতিক জিনিসের মধ্যেই প্রাণ আছে এবং তা মানুষের জীবনের উপর প্রভাব ফেলে) বসবাস ছিল। ১৯৫৬ সালে দেশটির স্বাধীনতার পর থেকে সুদান বেশিরভাগ স্বৈরশাসকদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল, যাঁরা একই ধরনের বিন্যাস অনুসরণ করেছিলেন এবং দারফুরি আফ্রিকান উপজাতি দক্ষিণ সুদানিজদের মতো জাতিগত গোষ্ঠীগুলির চাইতে আরবদের আধিপত্যবাদী আদর্শকেই পছন্দ করেছিল।

সর্বোপরি, সুদানের অর্থনীতি তেল নিষ্কাশন কৃষির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিলঅতএব, ভূমি ও তেলের উৎসের নিয়ন্ত্রণই ছিল পূর্ববর্তী সংঘর্ষগুলি প্রধান কারণ। তেল গৃহযুদ্ধের একটি প্রধান কারণ হয়ে ওঠে, যা অবশেষে দক্ষিণ সুদানের জন্ম দেয় এবং বিবাদের মূল বিষয় ছিল জমি নিয়ে বিরোধ।

প্রতিষ্ঠান কেন গুরুত্বপূর্ণ?

তিন নোবেলবিজয়ীর মতে, পার্লামেন্ট, বিচার বিভাগ এবং সুশৃঙ্খল সশস্ত্র বাহিনী একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রের মূল উপাদান। ২০১১ সালে লেখা তুলনামূলক উন্নয়নের ঔপনিবেশিক উত্স: একটি অভিজ্ঞতামূলক মূল্যায়ন’ (বা দ্য কলোনিয়ান অরিজিনস অব কম্প্যারাটিভ ডেভেলপমেন্ট: অ্যান এমপিরিকাল ইনভেস্টিগেশন) শীর্ষক গবেষণাপত্রে এই তিন অর্থনীতিবি বর্তমান রাজনৈতিক ও   অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের উপর ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাবগুলি মূল্যায়ন করেছিলেন

সুদানের দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরশাসক ওমর আল-বশির ঔপনিবেশিক বিভাজন করে শাসন’-এর নীতি থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন এবং অভ্যুত্থানমূলক প্রমাণের অংশ হিসাবে অন্যান্য গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এ রকম একটি দল ছিল জাঞ্জাউইড় নামে একটি আরব মিলিশিয়া, যা মূলত দারফুর অঞ্চলের বাগ্গারা আরবদের দ্বারা গঠিত হয়েছিল। এই সামরিক গোষ্ঠীটি ২০০৩ সালের দারফুর সংঘাতে একটি প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল, যার ফলে আদিবাসী আফ্রিকান সম্প্রদায়ের ব্যাপক গণহত্যা হয়েছিল।

নোবেলবিজয়ীরা আরও যুক্তি দিয়েছিলেন যে, একটি স্থিতিশীল অনুগত সশস্ত্র বাহিনী যে কোনও আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। যাই হোক, সুদানের সশস্ত্র বাহিনী সেই সব বিভিন্ন যুদ্ধবাজদের সঙ্গে চুক্তিতে এসেছিল, যাদের প্রাথমিক আনুগত্য ছিল তাদের গোষ্ঠী জাতিগত গোষ্ঠীর প্রতি এবং যারা সুদানের জাতীয় পরিচয় গঠনে বাধা দেয়।

নোবেলবিজয়ীরা আরও যুক্তি দিয়েছিলেন যে, একটি স্থিতিশীল অনুগত সশস্ত্র বাহিনী যে কোনও আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

এমনকি সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে জাতিগত পৃষ্ঠপোষকতার একটি স্পষ্ট বিন্যাস ছিল, যেখানে অন্যান্য আফ্রিকানের চাইতে আরবদের বেশি প্রাধান্য দেওয়া হত। এটি সুদানের সশস্ত্র বাহিনীকে জাতিগত সমস্যার বিষয়ে উত্তেজিত করে তুলেছে। আরবরা যখন সশস্ত্র বাহিনীর সিংহভা গঠন করে, তখন সুদান লিবারেশন মুভমেন্ট (এসএলএম) এবং জাস্টিস অ্যান্ড ইকুয়ালিটি মুভমেন্ট-এর (জেইএম) মতো বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি মূলত ফুর, জাঘাওয়া এবং মাসালিতের মতো আফ্রিকান গোষ্ঠীগুলি থেকে নিয়োগপ্রাপ্তদের নিয়ে গঠিত হয়সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই জাতিগত চ্যুতিরেখাগুলি জাতিগত সংঘাতে পরিণত হয় যেখানে রাষ্ট্র আরবদের পৃষ্ঠপোষকতা করে আফ্রিকান জাতিগোষ্ঠীকে প্রান্তিকতার দিকে ঠেলে দে, যা  আবার জাতিগত নির্মূলকরণকেই চালিত করে।

একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের আর একটি লক্ষণ হল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা একটি অর্থনীতির কাঠামোতে প্রতিফলিত হয়। স্বাধীনতার পর থেকে সুদানের অর্থনীতি তেল সম্পদের উপরই অতিরিক্ত নির্ভরশীল থেকেছে। ২০১১ সালে দক্ষিণ সুদানের বিচ্ছিন্নতার দরুন সব কিছুই বদলে যায় কারণ সুদান তার তেল সম্পদের ৭৫ শতাংশের উপর কর্তৃত্ব হারিয়েছিল। এটি সুদানের রাজনৈতিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে এবং পরবর্তীতে দেশটির বিদেশ ও অভ্যন্তরীণ উভয় নীতিতে বিপর্যয়কর ফলাফল সৃষ্টি করে।

নিজের তেল সম্পদ হারানোর সঙ্গে সঙ্গে সুদানের শাসকরা ইয়েমেনের যুদ্ধে সুদানি ভাড়াটে সৈন্যদের রফতানি শুরু করে, যা ছিল গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল বা উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্যের আর একটি লাভজনক উত্স। আন্তঃসংযুক্ত আন্তঃনির্ভর বিশ্বে যুদ্ধ নিয়ে পরোক্ষ চুক্তি করা হয় এবং সুদান সৌদি আরব সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (ইউএই) পক্ষে লড়াই করার জন্য ইয়েমেনে হাজার হাজার সৈন্য প্রেরণ করেছিল।

পূর্ববর্তী জাঞ্জাউইড় এই ভাবে একটি মিলিশিয়া থেকে একটি আধা-সামরিক বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছিল, যারা ইয়েমেনে যুদ্ধ করে প্রচুর অর্থায়ন পায় অস্ত্রের মজুদ লাভ করে। র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) নামে দলটির নতুন নামকরণ করা হয়। সুদানের ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে নেতা মোহাম্মদ হামদান দাগোলোর হাত ধরে দলটি দেশের রাজনীতিতে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ক্ষমতা সম্পদ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি হেমেতির উচ্চাকাঙ্ক্ষা কনফ্লিক্ট গোল্ডের (অর্থাৎ সোনার ব্যবসা থেকে আসা যে টাকা শুধু মাত্র ভাড়াটে সৈন্যদের জন্য ব্যবহার করা হয়) ব্যবসাতেও বৃদ্ধি পায়, যা সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (ইউএই) শোধনাগারগুলিতে রফতানি করা হয়।

যুদ্ধ বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে আরএসএফ বিশাল এলাকা দখল করে নেয় এবং চাদ, লিবিয়া, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র দক্ষিণ সুদান থেকে অস্ত্র ও ভাড়াটে সৈন্যের প্রবাহ দলটির ক্ষমতাকে আরও সশক্ত করতে থাকে।

২০১৯ সালে সুদানের রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলি দেশটির নেতাদের জন্য আরও বেশি সুযোগ তৈরি করেছে, যাঁরা দেশের ভবিষ্যৎ গঠনের চেষ্টা চালিয়েছেনউচ্চাভিলাষী হওয়ার কারণে হেমেতি সংযুক্ত আরব আমিরশাহির পাশাপাশি রাশিয়ার ওয়াগনার গোষ্ঠীর মিত্রদের সন্ধান করেছিলেন। এটি এমন একটি পরিপূরক সম্পর্ক ছিল, যেখানে আরএসএফ সুদানে তাদের খনি অন্যান্য স্বার্থ রক্ষার বিনিময়ে ইউএই ও ওয়াগনার গোষ্ঠীর কাছ থেকে আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা পেয়েছিল। যুদ্ধ বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে আরএসএফ বিশাল এলাকা দখল করে নেয় এবং চাদ, লিবিয়া, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র দক্ষিণ সুদান থেকে অস্ত্র ও ভাড়াটে সৈন্যের প্রবাহ দলটির ক্ষমতাকে আরও সশক্ত করতে থাকে।

উপসংহার

আরব বিশ্ব আফ্রিকার সংযোগস্থলে অবস্থিত সুদান ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। দেশটির বর্তমান সঙ্কটের শিকড় তার ঐতিহাসিক চ্যুতিরেখার মধ্যে নিহিত হলেও নিঃসন্দেহে তা পরবর্তী সরকার দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল এবং বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপের ফলে সেই সঙ্কট আরও বেড়েছে। সুদান দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের ব্যর্থতার সমস্যাগুলিকেই দর্শায়, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র-নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়। প্রতিটি সমাজেই নানাবিধ চ্যুতিরেখা থাকে কিন্তু শুধুমাত্র সুদানের মতো দুর্বল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই স্থানীয় নেতাদের যোগসাজশে বহিরাগত শক্তি দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সঙ্কট আরও বাড়িয়ে তোলে।

 


সমীর ভট্টাচার্য অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের অ্যাসোসিয়েট ফেলো।

কেলভিন বেনি জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পিএইচ ডি স্কলার।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.