২০২৪ সালের ২৩ জুলাই বাজেট প্রকাশের পর ভারতের অর্থমন্ত্রী ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-২৬ সালের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছেন। অর্থমন্ত্রী ২৫ ফেব্রুয়ারি তাঁর বাজেট বক্তৃতায় ২৪ জুলাইয়ের বাজেটের কথা বেশ কয়েক বার উল্লেখ করেছেন। কারণ এর মাধ্যমে এর আগে সরকারের মূল সিদ্ধান্তের পাশাপাশি আর্থিক ও নীতিগত সিদ্ধান্তগুলি তুলে ধরা হয়েছিল। এই বাজেটে সেই ধারাবাহিকতাই অব্যাহত থেকেছে।
এই প্রতিবেদনটিতে শহুরে জনবসতিগুলির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক বাজেট প্রস্তাবগুলির উপর মনোযোগ দেওয়া হয়েছে এবং শহরগুলির উপর সেই প্রস্তাবগুলির প্রভাব সমালোচনামূলক ভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
২৫-২৬ বাজেটের অনুচ্ছেদ ৮-এ ভারতে প্রয়োজনীয় রূপান্তরমূলক সংস্কার সম্পর্কিত লক্ষ্যগুলির কথা তুলে ধরা হয়েছে। এই লক্ষ্যগুলি ছ’টি ক্ষেত্রে বিভক্ত এবং ভারতের বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে এই লক্ষ্যগুলির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। লক্ষ্যগুলির মধ্যে তৃতীয়টি হল ‘নগর উন্নয়ন’। বাজেটে ভারতের বৃদ্ধির আখ্যানের একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত হিসাবে শহরগুলির স্বাস্থ্যকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, জুলাইয়ের বাজেটেও নগর উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল, যেখানে সাতটি ভিন্ন শহুরে বিষয়ের উপর আলোকপাতও করা হয়। তার মধ্যে শহরগুলিতে গ্রোথ হাব, শহরগুলির সৃজনশীল পুনরুন্নয়ন, ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়ন, শহুরে ও ভাড়ার আবাসন, জল সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধি, রাস্তার বাজার ও স্ট্যাম্প শুল্ক অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর বেশির ভাগই আবার ফেব্রুয়ারির বাজেটেও উল্লিখিত হয়েছে।
রাস্তার বিকিকিনি ক্রমশ শহরগুলিতে যে বৈধ কার্যকলাপ হিসাবে স্বীকৃত হচ্ছে… তা নিঃসন্দেহে একটি ভাল উদ্যোগ। এটি শহুরে দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থানের একটি কার্যকর উৎস।
যেহেতু শহুরে দরিদ্ররা শহরের একটি ক্রমবর্ধমান উপাদান, তাই অনুচ্ছেদ ৪৯ ও ৫০-এ বিশেষ ভাবে শহুরে দরিদ্রদের উপর মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। বাজেটে বলা হয়েছে যে, সরকার শহুরে কর্মীদের আর্থ-সামাজিক উন্নতির জন্য এমন একটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন করবে, যাতে তাঁদের আয় বৃদ্ধি করা যায়, তাঁদের স্থিতিশীল জীবিকা প্রদান করা যায় এবং তাঁদের জীবনে একটি গুণগত উন্নতি সাধন করা যায়। অনুচ্ছেদ ৫০-এ পূর্ববর্তী বছরগুলিতে চালু করা পিএম স্বনিধি প্রকল্পের উল্লেখ করা হয়েছে। আজ পর্যন্ত এই প্রকল্পের আওতায় ৬.৮ মিলিয়নেরও বেশি রাস্তার বিক্রেতাদের সুবিধা প্রদান করা হয়েছে এবং তাঁদের ঋণ থেকে মুক্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কারণ অনানুষ্ঠানিক ঋণ বাজারে অসাধ্য সুদের হারে তাঁরা ঋণ নিতে বাধ্য হন। এই প্রকল্পের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে বাজেটে ব্যাঙ্ক থেকে ঋণের সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং ৩০০০০ টাকার সীমা-সহ ইউপিআই-সংযুক্ত ক্রেডিট কার্ড প্রদানের পাশাপাশি সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তার মাধ্যমে প্রকল্পটিকে পুনরায় প্রকৌশলী করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
রাস্তার বিকিকিনি ক্রমশ শহরগুলিতে যে বৈধ কার্যকলাপ হিসাবে স্বীকৃত হচ্ছে… তা নিঃসন্দেহে একটি ভাল উদ্যোগ। এটি শহুরে দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থানের একটি কার্যকর উৎস। যাই হোক, রাস্তার বিক্রেতাদের বাড়তে থাকা সংখ্যা শহুরে পরিসরকে ক্রমশ কমিয়ে দিচ্ছে এবং এ হেন ব্যবসার পরিসরগত প্রয়োজনীয়তাগুলি এখনও শহরের পরিকল্পনাগুলিতে সম্পূর্ণ রূপে স্বীকৃত নয়। স্ট্রিট ভেন্ডিং বা রাস্তার বিকিকিনির সুবিধার জন্য একাধিক সক্রিয় ব্যবস্থার প্রয়োজন এবং এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল বিকিকিনির চাহিদার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা আইনকে সাযুজ্যপূর্ণ করে তোলা। তাই জনাকীর্ণ শহুরে পরিসরগুলিতে রাস্তার বিকিকিনিকে ঠিক করে খাপ খাওয়ানো অবশ্যই কষ্টসাধ্য অনুশীলন হতে চলেছে।
বাজেটের ৫৭তম অনুচ্ছেদটি আবার শহুরে পরিসরভিত্তিক অভিপ্রায়ের প্রেক্ষিতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের বাজেটের প্রস্তাবগুলিতে এ বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সেগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সংকল্প নেওয়া হয়েছে। আরও স্পষ্ট করে বললে, বাজেটে প্রস্তাব করা হয়েছে যে, ‘প্রশাসন, পৌর পরিষেবা, শহুরে জমি ও পরিকল্পনা সম্পর্কিত নগর খাতের সংস্কারকে উৎসাহ প্রদান করা হবে।’ এই প্রতিবেদনের শেষ অনুচ্ছেদটিতে এই সমস্যাটির আরও বিশদ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
৫৮ ও ৫৯তম অনুচ্ছেদে শহুরে তহবিল সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতার কথা বলা হয়েছে। ‘সিটিজি ফর গ্রোথ হাবস’, ‘ক্রিয়েটিভ রিডেভেলপমেন্ট অফ সিটিজ’ এবং ‘ওয়াটার ও স্যানিটেশন’ খাতে সরকার ১ ট্রিলিয়ন রুপির একটি তহবিল বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে। এর আগে ২৪ জুলাইয়ের বাজেটে এই কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে এই বিষয়ে বিশদ ভাবে ৫৯তম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, তহবিলটি ব্যাঙ্কযোগ্য প্রকল্পগুলির ব্যয়ের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থায়ন করবে। শহর ও রাজ্যগুলিকে এ ক্ষেত্রে আর্থিক ভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে এবং বন্ড, ব্যাঙ্ক ঋণ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে খরচের অন্তত ৫০ শতাংশ তহবিল দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি মোট ১ ট্রিলিয়ন টাকার পরিমাণের মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ১০০ বিলিয়ন টাকা বরাদ্দ করা হবে।
পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে এ কথা বেশ স্পষ্ট যে, গ্রোথ হাব ও চ্যালেঞ্জ ফান্ডের বেশির ভাগই বড় শহরের দিকে চালিত হবে। দেশের অন্য শহরগুলির খুব দুর্বল আর্থিক স্বাস্থ্যের কারণে মিউনিসিপ্যাল বন্ড বা ব্যাঙ্ক ঋণ সংগ্রহের কোনও উপায় নেই। এ ছাড়া অন্য শহরগুলি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা করতে পারে না। এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান অংশ মূলত বড় শহরগুলিতেই বরাদ্দ করা হবে এবং অন্য অনেক শহরের সর্বাঙ্গীন উন্নয়ন এর ফলে বাধাগ্রস্ত হবে। শহরগুলি এখন একটি ব্যাপক অনুদানবিহীন আদেশ বহন করছে এবং বাজেট সেই সমস্যাটির স্বীকৃতির জন্য সঠিক জায়গা হতে পারত। এটি আসলে এমন একটি ক্ষেত্র, যা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে গভীর ভাবে ভাবনা-চিন্তা করতে হবে।
নগর সংস্কার সংক্রান্ত একটি বিষয় বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশাসন, পৌর সেবা, শহুরে জমি ও পরিকল্পনার ক্ষেত্রে নগর সংস্কারকে উৎসাহিত করার সংকল্প অবশ্যই স্বাগত পদক্ষেপ। যেহেতু ভারতে নগরায়ণ হচ্ছে এবং দেশের শহরগুলি ক্রমশ জাতীয় অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে, তাই এ কথা স্বাভাবিক যে, জাতীয় বাজেটের শহরগুলির দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত।
বাজেটের বেশ কয়েকটি বিধানের মধ্যে অন্যতম যে প্রসঙ্গটি শহরগুলির জন্য সরাসরি ব্যয় না করলেও শহরগুলির উপর স্বাস্থ্যকর প্রভাব ফেলবে, তা হল বিমান যোগাযোগের সম্প্রসারণ। এগুলির বিশদ বিবরণ ৬৭তম ও ৬৮তম অনুচ্ছেদে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু বিমানবন্দরগুলি মূলত শহরগুলিতে অবস্থিত, তাই এটি শহরের গতিশীলতা ও ব্যবসার জন্য উত্সাহব্যঞ্জক হবে। ৬৭তম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প উড়ান-এর মাধ্যমে ১৫ মিলিয়ন মধ্যবিত্ত নাগরিকের আকাশপথে ভ্রমণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা হয়েছে। প্রকল্পটিতে ৮৮টি বিমানবন্দরকে আন্তঃসংযুক্ত করা হয়েছে এবং ৬১৯টি রুট চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার ১২০টি নতুন গন্তব্যে উন্নত আঞ্চলিক সংযোগ চালু করতে ও আগামী দশ বছরে ৪০ মিলিয়ন যাত্রী পরিবহণ করতে উত্সাহিত হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায়, বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বে হেলিপ্যাড ও ছোট বিমানবন্দরগুলিকে সমর্থন করার জন্য প্রকল্পটির পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়াও, রাজ্যের ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাতে বিহারে গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দরগুলিকে সহজতর করা হবে। পাটনা বিমানবন্দরের ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিহতায় একটি ব্রাউনফিল্ড বিমানবন্দরও তৈরি করা হবে।
মধ্যবিত্ত নাগরিকদের কর থেকে ত্রাণ প্রদান করা এবং এর ফলে করের বৃহত্তর ব্যবহার যে ক্ষমতার উপর প্রভাব ফেলবে, তা অবশ্যই শহরগুলির অর্থনীতিকে সাহায্য করবে। তাই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ৭০ শতাংশ নারীর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বহাল থাকবে। দক্ষতার জন্য ন্যাশনাল সেন্টার অফ এক্সিলেন্স, আইআইটি-র ক্ষমতার সম্প্রসারণ, শিক্ষার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় উৎকর্ষ কেন্দ্রগুলির পাশাপাশি সমস্ত জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা সংক্রান্ত শিক্ষা ও ডে-কেয়ার কেন্দ্রগুলির সম্প্রসারণ শহুরে জনবসতির জন্য অবশ্যই ভাল উদ্যোগ।
সবশেষে, নগর সংস্কার সংক্রান্ত একটি বিষয় বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশাসন, পৌর সেবা, শহুরে জমি ও পরিকল্পনার ক্ষেত্রে নগর সংস্কারকে উৎসাহিত করার সংকল্প অবশ্যই স্বাগত পদক্ষেপ। যেহেতু ভারতে নগরায়ণ হচ্ছে এবং দেশের শহরগুলি ক্রমশ জাতীয় অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে, তাই এ কথা স্বাভাবিক যে, জাতীয় বাজেটের শহরগুলির দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত। এ ছাড়াও, বাজেটে উদ্ধৃত শহুরে বিষয়গুলি হল এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে শহুরে সংস্কার কয়েক দশক ধরে অপেক্ষায় রয়েছে এবং এ হেন সংস্কার অত্যন্ত প্রয়োজন। যদি শহরগুলিকে ভারতের বৃদ্ধির আখ্যানের অন্যতম স্তম্ভ বলে মনে করা হয়, তবে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপত্যকে সঠিক দিকে চালিত করতে হলে শহরগুলির দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। যাই হোক, এটি একটি গুরুতর সমস্যার বিষয়। কারণ এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের তিনটি স্তর থেকে সহযোগিতার প্রয়োজন হবে এবং সেগুলি হল ভারত সরকার, রাজ্য সরকার ও স্থানীয় নগর সরকার। এই বাজেটে সংস্কারের কথাও বলা হয়েছে। এ কথা সহজেই অনুমেয় যে, কোনও বাজেট নথিতে বিপুল সংখ্যক সমস্যা মোকাবিলার কথা বলতে হয় এবং সে ক্ষেত্রে কোনও একটি মাত্র বিষয়ের শুধু মাত্র সংক্ষিপ্ত উল্লেখই করা যায়। যাই হোক, আশা করা যায় যে, এ ক্ষেত্রে আসলে কী করা প্রয়োজন তার একটি বিশদ বিশ্লেষণ এবং প্রশাসন, পরিকল্পনা, ভূমি ও নাগরিক পরিষেবাগুলিতে শহুরে ঘাটতির ক্ষেত্রগুলি নিয়ে একটি পৃথক নথিতে স্পষ্ট উল্লেখ ও তা নিয়ে জাতীয় স্তরে আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
রমানাথ ঝা অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ডিস্টিঙ্গুইশড ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.