১১ ও ১২ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মরিশাস সফর ভারত-মরিশাস দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা চিহ্নিত করে। এছাড়াও, এটি ভারতের মিশন সাগরকে — এই অঞ্চলে সকলের জন্য সুরক্ষা এবং বৃদ্ধি — আরও গতি দেয়। এটি পশ্চিম ভারত মহাসাগর অঞ্চলের জন্য মোদীর দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
মরিশাসের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নবীনচন্দ্র রামগুলাম, ১২ মার্চ মরিশাসের জাতীয় দিবস উদযাপনে মোদীকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। যদিও এই সফরের কেন্দ্রবিন্দু স্পষ্টতই সমুদ্র সুরক্ষা, অন্য বিষয়গুলিও অ্যাজেন্ডায় ছিল, বিশেষ করে স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, পশ্চিম ভারত মহাসাগর অঞ্চলের উপকূলে সামুদ্রিক সুরক্ষা ভারতের কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত মরিশাসের আগলেগা দ্বীপে একটি নতুন বিমানঘাঁটি ও জেটি উদ্বোধন করে, যা এই অঞ্চলে একটি নেট সুরক্ষা প্রদানকারীর ভূমিকা পালনের আগ্রহকে প্রতিফলিত করে।
নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য অংশীদারিত্ব
ভারত মরিশাসের সামুদ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘদিনের অংশীদার। ১৯৯৩ সাল থেকে মরিশাসের জাতীয় উপকূলরক্ষী বাহিনীকে নয়াদিল্লি কর্তৃক লিজ দেওয়া অন-বোর্ড সরঞ্জামসহ ২০১৭ সালে একটি ইন্টারসেপ্টর বোট সি-১৩৯ মরিশাস সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২০২২ সালে মরিশাস আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য ২০২০ সালে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও মলদ্বীপ প্রতিষ্ঠিত কলম্বো নিরাপত্তা সম্মেলনেও যোগ দেয়।
আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসাবে রয়ে গিয়েছে এবং মরিশাসও এর ব্যতিক্রম নয়।
এই সামুদ্রিক সহযোগিতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভারতীয় নৌবাহিনী হোয়াইট শিপিং সম্পর্কিত তথ্য বিনিময়ের জন্য একটি প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করতে প্রস্তুত। চুক্তিতে তথ্যের রিয়েল-টাইম ভাগাভাগি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা সামুদ্রিক নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে এবং মরিশাসের বাণিজ্য করিডোরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। এছাড়া, ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর দল ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজ ও ভারতীয় বিমানবাহিনীর আকাশ গঙ্গা স্কাইডাইভিং দল উদযাপনে অংশগ্রহণ করবে। এটি নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে প্রতিফলিত করে।
আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসাবে রয়ে গিয়েছে এবং মরিশাসও এর ব্যতিক্রম নয়। এই সফরের সময়, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সেন্টার ফর ওশন ইনফরমেশন সার্ভিসেস এবং মরিশাসের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সমুদ্র অঞ্চল ব্যবস্থাপনা এবং সমুদ্র পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা সহযোগিতার কাঠামো তৈরির জন্য একটি সমঝোতাপত্র (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে। এছাড়াও, মরিশাসের জনসেবা ও প্রশাসনিক সংস্কার মন্ত্রক এবং ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর গুড গভর্নেন্স পাঁচ বছর ধরে মরিশাসের ৫০০ জন সরকারি কর্মচারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য একটি পৃথক সমঝোতাপত্র স্বাক্ষর করে।
কোভিড-১৯-এর সময় মরিশাসের সঙ্গে ভারতের স্বাস্থ্য কূটনীতি পূর্ণভাবে প্রদর্শিত হয়েছিল, যখন ভারত তাদের ১ লক্ষ কোভিশিল্ড টিকা দান করেছিল এবং সেই সঙ্গে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আরও এক লক্ষ কোভিশিল্ড এবং ২ লক্ষ ডোজ কোভ্যাক্সিন পাঠিয়েছিল। খুব কম লোকই জানেন যে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর রামগুলাম নতুন দিল্লির এইমস ট্রমা সেন্টার থেকে তাঁর চিকিৎসা করিয়েছিলেন। এখন যেহেতু মরিশাস ভারতের অর্থায়নে একটি নতুন স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি করেছে, তাই উভয় নেতাই এটি উদ্বোধন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য
বাণিজ্য ক্ষেত্রে ভারত ও মরিশাস ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে ব্যাপক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্ব চুক্তি (সিইসিপিএ) স্বাক্ষর করে। এটি আফ্রিকার দেশটির সঙ্গে ভারতের স্বাক্ষরিত প্রথম বাণিজ্য চুক্তি। সিইসিপিএ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধু দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাই জোরদার হবে না, বরং চিনের অনুরূপ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে লড়াই করতেও সাহায্য করবে।
২০১৯ সালে চিন পণ্য ও পরিষেবার বাণিজ্য উদারীকরণ ও প্রসার এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র অন্বেষণ এবং বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য মরিশাসের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর করে। এ ছাড়া মরিশাসের সঙ্গে তার অর্থনৈতিক কূটনীতিকে উন্নত করার জন্য বেজিং ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ব্যাঙ্ক অফ মরিশাসে (বিওএম) একটি চিনা রেনমিনবি ক্লিয়ারেন্স সেন্টারও স্থাপন করে।
সিইসিপিএ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধু দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাই জোরদার করবে না বরং চিনের অনুরূপ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে লড়াই করতেও সাহায্য করবে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে রামগুলাম তাঁর দেশের দুটি বৃহৎ এশীয় প্রতিবেশীর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে অসাধারণ কূটনৈতিক দক্ষতা দেখিয়েছেন। মোদীকে আমন্ত্রণ জানানো মরিশাসের ক্ষেত্রে রামগুলামের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি ভারতের গুরুত্বকে তুলে ধরে।
এই সফরকে এই অঞ্চলের বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক স্রোতের পরিপ্রেক্ষিতেও বুঝতে হবে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে যুক্তরাজ্য চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব মরিশাসের কাছে হস্তান্তর করতে সম্মত হয় এই শর্তে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য দিয়েগো গার্সিয়ার প্রবালদ্বীপে সামরিক ঘাঁটি বজায় রাখবে। চুক্তির সূক্ষ্ম বিষয়গুলি এখনও চূড়ান্ত হয়নি, তবে ভারত চাগোসের উপর মরিশাসের সার্বভৌমত্বকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছে।
তারপর থেকে মরিশাস ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই তাদের সরকারের পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তিনি বর্তমান চুক্তিকে সমর্থন করতে পারেন, তবে উভয় পক্ষই সম্ভবত এর কিছু বিধান পুনর্বিবেচনা করতে চাইবে। পারস্পরিকভাবে উপকারী চুক্তি অর্জনে ভারতের উপস্থিতি কাজের হবে।
মরিশাসের প্রায় ৭০ শতাংশ জনসংখ্যার শিকড় ভারতে ছিল, এবং এদের প্রায় অর্ধেক হিন্দু। সুতরাং, ভারতীয় প্রবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে মোদীর নির্ধারিত মিথস্ক্রিয়াও ফলপ্রসূ হতে পারে।
২০২৪ সালের নভেম্বরের পার্লামেন্ট নির্বাচনে রামগুলামের নেতৃত্বাধীন জোট দেশজুড়ে ৬২টি আসনের মধ্যে ৬০টি আসন জিতে বিশাল জনমত অর্জন করে। এই জয় তাঁকে তাঁর দেশের বিদেশনীতির গতিপথ নির্ধারণের জন্য একটি স্বস্তিজনক অবস্থানে নিয়ে আসে, এবং একটি কৌশলগত কূটনৈতিক ভারসাম্য নিশ্চিত করে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁর আমন্ত্রণ কৌশলগত অংশীদার হিসাবে ভারতের প্রতি তাঁর অগ্রাধিকারগুলি প্রতিফলিত করে।
এই ভাষ্যটি মূলত দ্য প্রিন্টে প্রকাশিত হয়েছিল।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.