ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রি-ট্রায়াল চেম্বার-আই (পিটিসি) সম্প্রতি ইজরায়েলের প্রাইম মিনিস্টার বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং ডিফেন্স মিনিস্টার ইয়োভ গ্যালান্টের পাশাপাশি হামাসের তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। এ হেন পরোয়ানা আসলে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের কারণেই জারি করা করা হয়েছে, বিশেষত ফিলিস্তিনি বেসামরিকদের বিরুদ্ধে ইজরায়েলি নেতাদের দ্বারা নিযুক্ত একটি ‘স্টারভেশন স্ট্র্যাটেজি’ বা ‘অনাহার কৌশল’-এর নিরিখে।
এই ঘটনা আইসিসি-কে ফের পর্যবেক্ষণের আওতায় নিয়ে এসেছে এবং আদালতের এক্তিয়ার, নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
আইসিসি গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য রোম সংবিধির অধীনে বিচার করে এবং শুধুমাত্র স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) তরফে রেফারেলের মাধ্যমে কাজ করে। আইসিসি একটি শেষ আলোকবর্তিকাসম আদালত হিসাবে কাজ করে এবং এটির আইনের ১৭-১৯তম অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘পরিপূরক বিচারব্যবস্থা’ নীতির মাধ্যমে আইসিসি জাতীয় অপরাধমূলক বিচার ব্যবস্থার পরিপূরক হয়ে ওঠে। এই নীতিটি শুধুমাত্র তখনই অপরাধের বিচারে আইসিসি-র ভূমিকাকে সীমিত করে দেয়, যখন জাতীয় আদালত অনিচ্ছা বা অক্ষমতার কারণে কাজ করতে ব্যর্থ হয়। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইন – যেমনটা কঙ্গোলিজ যুদ্ধবাজ টমাস লুবাঙ্গা ও লিবিয়ার প্রাক্তন নিরাপত্তা প্রধান আল-তুহামি মোহাম্মদ-খালেদের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল - নজির সৃষ্টি করেছে।
এ হেন পরোয়ানা আসলে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের কারণেই জারি করা করা হয়েছে, বিশেষত ফিলিস্তিনি বেসামরিকদের বিরুদ্ধে ইজরায়েলি নেতাদের দ্বারা নিযুক্ত একটি ‘স্টারভেশন স্ট্র্যাটেজি’ বা ‘অনাহার কৌশল’-এর নিরিখে।
বিচারবিভাগীয় প্রশ্ন
আইসিসির মতাদেশ তার এক্তিয়ারকে সেই ১২৪টি ‘স্টেট পার্টি’ বা ‘রাষ্ট্রীয় পক্ষের’ মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে, যারা রোম সংবিধিতে স্বাক্ষরকারী এবং ইজরায়েল সেই তালিকার মধ্যে নেই। এটি ইজরায়েলি নেতাদের ক্ষেত্রে তথাকথিত অপরাধের নিরিখে আদালতের এক্তিয়ারের বিষয়ে চ্যালেঞ্জ উত্থাপন করে। পিটিসি পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, তার মনোযোগ প্যালেস্তাইন নামের রাষ্ট্রীয় পক্ষের মধ্যে সংঘটিত অপরাধের উপর ২০১২ সালের রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবের উপর নির্ভর করে, যা প্যালেস্তাইনকে একটি অ-সদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং তাই প্যালেস্তাইন চুক্তিগুলি অনুমোদন করতে সক্ষম। ইজরায়েল এই যুক্তি দিয়েই এর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল যে, প্যালেস্তাইনের এক্তিয়ার প্রদানের রাষ্ট্রীয়তার অভাব রয়েছে এবং এই ধরনের যে কোনও এক্তিয়ারের পরিবর্তে বিষয়টিকে অসলো চুক্তির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ হওয়া উচিত, যা ইজরায়েলি নাগরিকদের উপর প্যালেস্তাইনের কর্তৃত্বকে খর্ব করে। তবে পিটিসি ইজরায়েলের চ্যালেঞ্জকে অন্যায্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং জোর দিয়ে বলেছে যে, বিচারবিভাগীয় চ্যালেঞ্জগুলি শুধুমাত্র গ্রেফতারি পরোয়ানা বা সমন জারির পরেই করা যেতে পারে। বৈসাদৃশ্যপূর্ণ অবস্থানগুলি আন্তর্জাতিক চুক্তির অসঙ্গতি দ্বারা সৃষ্ট চ্যালেঞ্জকে তুলে ধরে, বিশেষ করে যখন আইসিসি-র রায়গুলি এই কাঠামোর সম্পূর্ণ বিপরীত।
এমনকি যদি কেউ আইসিসির এক্তিয়ারের দাবি মেনে নেয়, তবে ইজরায়েলের প্রেক্ষাপটে পরিপূরক এক্তিয়ারের প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ইজরায়েলের একটি শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা রয়েছে, যা দেশটির কার্যনির্বাহী ও আইনসভার প্রতি ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, ইজরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি সরকারের যুক্তিসঙ্গত সীমাবদ্ধতা আইন বাতিল করেছে এবং দেশের ইতিহাসে প্রথম বারের মতো কোনও মৌলিক আইন বাতিল করা হয়েছে। একই ভাবে, অ্যাটর্নি জেনারেল আইসিসি মামলার প্রেক্ষাপটে বিচারব্যবস্থার উপর কারসাজি করার জন্য উচ্চস্তরের নেতাদের তথাকথিত প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে নীতিগত অবাধ্যতা দর্শিয়েছেন। এগুলি ইজরায়েলের আইনি কাঠামোর স্থিতিস্থাপকতাকেই দর্শায়। এটি আইসিসি-র হস্তক্ষেপকে বাধা দেয় এবং আদালতের আদেশের ব্যাখ্যা সম্পর্কে বৃহত্তর উদ্বেগ তুলে ধরে।
ইজরায়েলের একটি শক্তিশালী বিচার ব্যবস্থা রয়েছে, যা দেশটির কার্যনির্বাহী ও আইনসভার প্রতি ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে কাজ করে।
অনাক্রম্যতা সংক্রান্ত সমস্যা
ব্যক্তিগত অনাক্রম্যতা ঐতিহ্যগত ভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তাদের ঘোষিত ক্ষমতায় সম্পাদিত কার্যকলাপের জন্য বিদেশি বিচারব্যবস্থায় বিচার থেকে রক্ষা করে। এই নীতিটি প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যে নিহিত ও আংশিক ভাবে কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিয়েনা কনভেনশনের বিধান দ্বারা সমর্থিত। যাই হোক, রাষ্ট্রপ্রধান-সহ আধিকারিকদের আইসিসি গ্রেফতারি পরোয়ানার অধীনে কোনও অনাক্রম্যতা নেই, এমনকি অরাষ্ট্রীয় পক্ষ থেকে এ হেন পরোয়ানা জারি হলেও কোনও অনাক্রম্যতা থাকে না। যুগোস্লাভিয়া (আইসিটিওয়াই) এবং রোয়ান্ডার (আইসিটিআর) জন্য ট্রাইব্যুনাল এবং অন্য অভিযুক্তদের মধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন ও প্রাইম মিনিস্টার নেতানিয়াহু এ ক্ষেত্রে বিশিষ্ট উদাহরণ। যাই হোক, এই ধরনের বিষয়গুলি রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতায় পরিপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় দলগুলি প্রায়শই তাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য রোম সংবিধির অধীনে তাদের বাধ্যবাধকতাগুলিকে এর আওতাভুক্ত করে এবং আন্তর্জাতিক আইন একাধিক ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে।
রাষ্ট্রীয় পক্ষ মঙ্গোলিয়া প্রেসিডেন্ট পুতিনকে তাঁর সাম্প্রতিক সফরের সময় গ্রেফতার করতে অস্বীকার করেছিল এবং এ ক্ষেত্রে তারা সংবিধির ৯৮তম অনুচ্ছেদকে উদ্ধৃত করেছিল, যা রাষ্ট্রগুলিকে তাদের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার সঙ্গে বিরোধিতাপূর্ণ হলে আত্মসমর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ করে দেয়। মঙ্গোলিয়া জোর দিয়েছিল যে, কোনও প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন, এমনকি আইসিসি-র ক্ষেত্রেও, রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানদের অনাক্রম্যতাকে অগ্রাহ্য করে না বা অস্বীকার করে না। একই ভাবে, ২০১৭ সালে জর্ডনও তৎকালীন সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে আটক করতে অস্বীকার করেছিল, যিনি সেখানে আরব লিগের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছিলেন। জর্ডন যুক্তি দিয়েছিল যে, তারা এই গ্রেফতার করতে বাধ্য নয়। কারণ বশির নন-আইসিসি সদস্যের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন এবং ১৯৫৩ সালের কনভেনশন অন প্রিভিলেজস অ্যান্ড ইমিউনিটিস অফ আরব লিগের অধীনে অনাক্রম্যতা পেয়েছেন। আইসিসি অবশ্য সংবিধির ২৭তম অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে এই যুক্তিগুলিকে খারিজ করে দিয়েছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সরকারি ক্ষমতা ব্যক্তিদের দায়বদ্ধতা থেকে ছাড় প্রদান করে না।
তার পর রাষ্ট্রীয় পক্ষগুলির তরফে ভিন্নমত আছেই। চেকিয়ার প্রাইম মিনিস্টার পেত্র ফিয়ালা গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত ইজরায়েলি নেতাদের সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সমান হিসেবে ব্যাখ্যা করার জন্য ও সেই নেতাদের কর্তৃত্বকে ক্ষুণ্ণ করার জন্য আইসিসি-র তীব্র সমালোচনা করেছেন। আইসিসি-র জন্য জটিল বিষয় হল মালাবো প্রোটোকলের মতো প্রস্তাব, যা প্রস্তাবিত আফ্রিকান কোর্ট অফ জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস-এর সংবিধি সংশোধন করতে চায়, যাতে এটিকে ফৌজদারি এক্তিয়ারের অন্তর্ভুক্ত করা যায় এবং যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান ও উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের অনাক্রম্যতা দেওয়া হয়।
বেছে বেছে বিচার?
আইসিসি দ্বারা অভিযুক্ত সমস্ত ব্যক্তির মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি আফ্রিকান, যার ফলে ন্যায়বিচারের বিরুদ্ধে ‘সুনির্দিষ্ট আবেদন’ করার অভিযোগ উঠেছে। উল্লেখযোগ্য ভাবে, মালাবো প্রোটোকলের অনাক্রম্যতা অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকে কেউ কেউ আইসিসি-র আফ্রিকান সমালোচনার প্রতিক্রিয়া হিসাবে যুক্তি দিয়েছেন। আইসিসি-র বিরুদ্ধে আর একটি অভিযোগ হল শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রতি তার অনুভূত শ্রদ্ধা, যা ইউএনএসসি-র ২০০২ সালের মার্কিন সৈন্যদের বিচার থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের মতো উদাহরণ দ্বারা প্রমাণিত। আবু ঘ্রাইব কেলেঙ্কারির পরে বিশ্বব্যাপী ক্ষোভের দরুন অবশ্য এই নীতিটিকে বাতিল করে দেওয়া হয়। একটি অ-স্বাক্ষরকারী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার বাহিনীর উপর আইসিসি তদন্তের বিরোধিতা করেছিল। এ ক্ষেত্রে আমেরিকান সার্ভিস-মেম্বারস প্রোটেকশন অ্যাক্ট উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে কিছু নির্বাচিত আইসিসি-র তদন্তকে সমর্থন করেছে। এই দ্বৈততা বাহ্যিক প্রভাব ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিপরীতে স্বাধীন ভাবে কাজ করার বিষয়ে আইসিসি-র ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সর্বোপরি, আইসিসি এর স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রের নেতাদের বিচার করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ও বিচারের নিরপেক্ষ সালিস হিসাবে নিজের বৈধতাকে ক্ষুণ্ণ করে।
আইসিসি-র জন্য জটিল বিষয় হল মালাবো প্রোটোকলের মতো প্রস্তাব, যা প্রস্তাবিত আফ্রিকান কোর্ট অফ জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস-এর সংবিধি সংশোধন করতে চায়, যাতে এটিকে ফৌজদারি এক্তিয়ারের অন্তর্ভুক্ত করা যায় এবং যেখানে রাষ্ট্র প্রধান ও উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের অনাক্রম্যতা দেওয়া হয়।
অভিযোগের যোগ্যতা
ইজরায়েলি নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগটি যুদ্ধের একটি পদ্ধতি হিসাবে অনাহারের আগ্রাসী ব্যবহার এবং গাজার বেসামরিক জনগণকে গণহত্যা থেকে আলাদা করে ত্রাণ প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে সম্পর্কিত। কম্যান্ড দায়িত্বের নীতির অধীনে সমনটি বিশেষ করে ইজরায়েলের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে জারি করা হয়েছে এবং প্রমাণ হিসাবে এমন জনসাধারণের স্বীকারোক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাঁরা ইজরায়েলি নেতৃত্বের পদক্ষেপের দরুন অনাহারে ভুগছেন। এ ক্ষেত্রে গাজাকে ‘সম্পূর্ণ নির্মূল’ করার জন্য মন্ত্রী গ্যালান্টের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে বিদ্যুৎ, খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইজরায়েলের বিরুদ্ধে মানবিক সহায়তা অবরুদ্ধ করা, ক্রাচ ও মাতৃত্বকালীন কিটের মতো পণ্যগুলির জন্য চালান প্রত্যাখ্যান করার দ্বৈত ব্যবহারের অভিযোগও আনা হয়েছে। অস্থায়ী সীমান্ত পারাপার পুনরায় চালু করা হয়েছিল এবং যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, তাদের কার্যকারিতা সামরিক পদক্ষেপের কারণে হ্রাস পেয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিটেরিয়ান ল বা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বেসামরিক নাগরিকদের সাহায্যের জন্য নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকারকে বাধ্যতামূলক করেছে। তবে বর্তমান মামলায় আইসিসি-র বক্তব্য আলোচনার অবকাশ রাখে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে যখন প্রসিকিউটর পিটিসি-র সামনে সমন জারি করার আবেদন জমা দেন, তখন ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) ফেমিন রিভিউ কমিটি বলে যে, ‘উত্তরাংশের রাজ্যগুলিতে অনুমোদিত খাদ্য ও অ-খাদ্য পণ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে’ এবং ‘পুষ্টি, জল, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) এবং স্বাস্থ্য খাতে প্রতিক্রিয়া বাড়ানো হয়েছিল।’ তাই দুর্ভিক্ষের কোনও প্রমাণ নেই। সর্বোপরি, ত্রাণ প্রবাহে বাধা দেওয়ার বিক্ষিপ্ত দৃষ্টান্ত বা রাজনৈতিক ভাবে অভিযুক্ত বিবৃতিগুলি ইচ্ছাকৃত ‘নীতি’ বা ‘সংগঠিত ও নিয়মিত বিন্যাস’-এর জন্য আইসিসি-র থ্রেশহোল্ড বা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে না এবং একটি জটিল মানবিক সঙ্কটের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা যায় না। শেষ পর্যন্ত, আইসিসি-র কার্যক্রম বিদ্যমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইজরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার দাবির বিরুদ্ধে ভারসাম্যপূর্ণ অভিপ্রায় প্রমাণ করার জন্য আবার প্রমাণের পর্যাপ্ততার উপর নির্ভর করে।
বিশ্বাসযোগ্যতা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ
ইজরায়েলি নেতা ও হামাসের ব্যক্তিদের জন্য আইসিসি-র গ্রেফতারি পরোয়ানা বিতর্কিত আবহে ন্যায়বিচার প্রদানের চ্যালেঞ্জগুলি তুলে ধরে। আদালতের লক্ষ্য অপরাধীদের জবাবদিহি করা এবং তার কার্যকলাপ এক্তিয়ার, পরিপূরকতা ও বৈধতা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে। স্থায়ী ইউএনএসসি সদস্যদের অনুপস্থিতি – অর্থাৎ রাশিয়া, চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতি – আইসিসি-র কর্তৃত্বকে ক্ষুণ্ণ করে। কারণ তারা রেফারেল ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ভারতের মতো প্রভাবশালী বৈশ্বিক শক্তিদের অনুপস্থিতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রের প্রত্যাহার আইসিসির এক্তিয়ারের সুযোগকে সীমাবদ্ধ করে এবং তার প্রাসঙ্গিকতাকেও হ্রাস করে। এর অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিসংখ্যান – অর্থাৎ আইসিসি-র সূচনার পর থেকে ৩২টি মামলার মধ্যে ১৪টিই অমীমাংসিত রয়ে গিয়েছে - এই চ্যালেঞ্জগুলিকে তীব্রতর করেছে।
পরিপূরক বিচারব্যবস্থার প্রচারের জন্য আইসিসি-কে অবশ্যই আফ্রিকান কোর্ট অন হিউম্যান অ্যান্ড পিপলস রাইটস-এর মতো আঞ্চলিক আদালতের সঙ্গে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে।
এই মুহূর্তে আশু প্রয়োজন হল অ্যাসেম্বলি অফ স্টেট পার্টিগুলির মাধ্যমে আইসিসি-র ব্যাপক সংস্কার। সহযোগিতা ও যে কোনও মামলার ব্যবস্থাপনা বৃদ্ধির জন্য একটি ইন্ডিপেন্ডেন্ট এক্সপার্ট রিভিউ ছাড়াও বিচারক ও কর্মকর্তাদের নির্বাচন করার জন্য একটি কঠোর পরীক্ষণ ব্যবস্থা, মামলাগুলির জন্য গ্রহণযোগ্যতা প্রক্রিয়া সুগম করা ও অংশীদারদের সঙ্গে বৃহত্তর সহযোগিতা বৃদ্ধি, বিশেষ করে যে সব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের আরও বেশি করে অংশগ্রহণ প্রয়োজন। পক্ষপাতের অভিযোগ মোকাবিলা করার জন্য একটি স্থায়ী কাঠামো প্রতিষ্ঠা করলে তা আদালতের নিরপেক্ষতার প্রতি আস্থাকে শক্তিশালী করতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ ভাবে, পরিপূরক বিচার ব্যবস্থার প্রচারের জন্য আইসিসি-কে অবশ্যই আফ্রিকান কোর্ট অন হিউম্যান অ্যান্ড পিপলস রাইটস-এর মতো আঞ্চলিক আদালতের সঙ্গে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে। এটির বৈধতা, নাগাল ও প্রয়োগের ক্ষমতা প্রসারিত করার জন্য অ-স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে আরও বেশি করে সম্পৃক্ত হতে হবে। সর্বোপরি, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাগুলির মাঝে পথ করে নেওয়ার সময় আইসিসি-কে অবশ্যই ন্যায়বিচারের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি বজায় রাখতে হবে।
প্রতি বছর সশস্ত্র সংঘর্ষে অগণিত মানুষের মৃত্যু হয়। পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলো অনুসারে, ২০২৩ সালে ৩৪টি দেশে ৫৯টি ‘রাষ্ট্রভিত্তিক সংঘাত’ প্রত্যক্ষ করা গিয়েছে, যা ১৯৪৬ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ। এর পাশাপাশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে ‘একতরফা হিংসা’র জন্য ১৩টি জাতীয় সরকারকে দায়ী করার খবর পাওয়া গিয়েছে। এই প্রেক্ষিতে - যেখানে স্থানীয় আদালত ন্যায়বিচার দিতে অক্ষম – আইসিসি-র একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যাই হোক, উল্লেখযোগ্য সংস্কার ছাড়া আইসিসি-র প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতায় ভাঙন ধরবে ও বিশ্বের সবচেয়ে গুরুতর অপরাধের বিচার প্রদানে আইসিসি-র মতাদেশ পূরণে ব্যর্থতার সম্ভাবনা রয়েই যায়।
জয়বাল নাদুভাত অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট।
ধর্মিল দোশি অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.