এই নিবন্ধটি রাইসিনা এডিট ২০২৫-এর অংশ।
চিরাচরিত ভাবে সরকারি কর্মকর্তারা অন্যান্য সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে অর্থনৈতিক, সামরিক ও বৈশ্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সম্পর্ক জোরদার করার জন্য বিদেশনীতি পরিচালনা করে আসছেন। তবে বিংশ শতাব্দীতে বিশেষ করে ট্র্যাক টু স্তরের কূটনীতির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে আমরা দেখেছি যে, রাষ্ট্র-বহির্ভূত সত্তাগুলি বিদেশনীতির অগ্রগতিতে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর মধ্যে রয়েছে থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, ক্রীড়া কূটনীতি - যেখানে ক্রীড়াবিদরা দেশগুলির মধ্যে সদিচ্ছা বৃদ্ধি করেন, শিল্পী ও সঙ্গীতজ্ঞদের দ্বারা পরিচালিত সাংস্কৃতিক কূটনীতি এবং মানবিক কূটনীতি, যেখানে বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা মানবিক ত্রাণ ও সাহায্য সরবরাহের জন্য আলোচনায় অংশগ্রহণ করে। একবিংশ শতাব্দীতে বিদেশনীতির ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হয়েছে, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ক্ষেত্রগুলিতে, যেখানে বেসরকারি খাত ও এনজিওগুলি রাষ্ট্র-রাজ্য স্তরের বহু অংশীদারমূলক সমাধানে অবদান রাখে। বিদেশনীতি প্রসারিত হচ্ছে এবং বিদেশনীতির নতুন ও উদীয়মান রূপটি দীর্ঘায়ু সম্পর্কিত। বিশ্বব্যাপী অতিমারি, বার্ধক্যজনিত জনসংখ্যা, অ-সংক্রামক রোগের (এনসিডি) বৃদ্ধি এবং জৈবপ্রযুক্তি ও দীর্ঘায়ু থেরাপিউটিকসে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করার মতো চ্যালেঞ্জগুলির পরিপ্রেক্ষিতে কূটনৈতিক শক্তির নতুন রূপ আবির্ভূত হচ্ছে।
একবিংশ শতাব্দীতে বিদেশনীতির ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হয়েছে, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ক্ষেত্রগুলিতে, যেখানে বেসরকারি খাত এবং এনজিওগুলি রাষ্ট্র-রাজ্য স্তরের বহু অংশীদারমূলক সমাধানে অবদান রাখে।
লঞ্জিভিটি ডিপ্লোমেসি বা দীর্ঘায়ু কূটনীতির এই উদীয়মান ক্ষেত্রে দেশগুলি বৈজ্ঞানিক বিনিময়, শিক্ষামূলক কর্মসূচি, কর্পোরেট বিনিময় ও সর্বোত্তম অনুশীলন, শিল্প মানদণ্ড, উৎপাদন ও প্রায় অসম্ভব কোনও উদ্ভাবনী সহযোগিতার (মুনলাইট কোল্যাবরেশন) ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি বহুমুখী জন-কূটনীতি প্রচেষ্টায় সম্পৃক্ত হবে।
দীর্ঘায়ু বিদেশনীতি কৌশলের চারটি মূল ক্ষেত্র রয়েছে:
১. দীর্ঘায়ু নীতি চিন্তা নেতৃত্ব
২. থেরাপিউটিকস কূটনীতি
৩. বৈজ্ঞানিক গবেষণার অগ্রগতি
৪. বৈশ্বিক মানদণ্ড নির্ধারণ
দীর্ঘায়ু নীতি কেন্দ্রিক নেতৃত্ব
অনুমান করা হচ্ছে ২০২৩ সালে ৬০ বছরের বেশি বয়সি মানুষের বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যা ১.১ বিলিয়ন থেকে ২০৩০ সালে ১.৪ বিলিয়নে উন্নীত হবে। ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, ৮০ বছর বা তার বেশি বয়সি প্রায় ২৬৫ মিলিয়ন ব্যক্তি কমবয়সি জনসংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যাবে। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সেন্টিনেরিয়ান বা শতবর্ষী জনসংখ্যা (অর্থাৎ ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সি মানুষ) আটগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। জাপান, সিঙ্গাপুর, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের মতো দেশগুলি দীর্ঘ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য ইতিমধ্যেই সক্রিয় ভাবে অভ্যন্তরীণ নীতির বাস্তবায়ন করেছে। এই দেশগুলি দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বা বহুপাক্ষিক মঞ্চে সর্বোত্তম অনুশীলনগুলি ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে অথবা অনুরূপ নীতি বাস্তবায়নে অন্য দেশগুলিকে দক্ষতা ও সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে এই অভ্যন্তরীণ নীতির সাফল্যকে কাজে লাগাতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জাপানের পুষ্টি শিক্ষা অনুশীলন জনসংখ্যার স্বাস্থ্যের সময়কালকে কী ভাবে প্রভাবিত করেছে, তা থেকে অনেক কিছু শেখার রয়েছে। একই ভাবে, সিঙ্গাপুরের দীর্ঘায়ু-মনস্ক নাগরিক সুস্থতা সংক্রান্ত পরিকল্পনাগুলি তাদের জনসংখ্যার গতিশীলতা ও অনুশীলনে অবদান রেখেছে এবং অন্য দিকে নরওয়ে স্বাস্থ্যের সময়কালকে উন্নত করার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, উদার সমাজকল্যাণ ও জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রচারগুলিকে সমন্বিত করেছে।
সিঙ্গাপুরের দীর্ঘায়ু-মনস্ক নাগরিক সুস্থতা সংক্রান্ত পরিকল্পনাগুলি তাদের জনসংখ্যার গতিশীলতা ও অনুশীলনে অবদান রেখেছে এবং অন্য দিকে নরওয়ে স্বাস্থ্যের সময়কালকে উন্নত করার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, উদার সমাজকল্যাণ ও জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রচারগুলিকে সমন্বিত করেছে।
বিশ্ব জুড়ে নাগরিকরা দীর্ঘ জীবনযাপনের পরিকল্পনা শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে সরকারগুলিও অন্যান্য দেশের সফল ভাবে বাস্তবায়িত নীতিগুলি অনুকরণ করার চেষ্টা করবে। এটি কূটনৈতিক শক্তির জন্য ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হবে এবং দীর্ঘায়ু, জনসংখ্যার স্বাস্থ্য ও এর মধ্যে উদ্ভূত রাষ্ট্রীয় দক্ষতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্ব নেতা হিসাবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার জন্য সকল আকারের দেশগুলির জন্য একটি সুযোগ হবে।
থেরাপিউটিকস কূটনীতি
কোভিড-১৯ অতিমারি বিশ্বকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, আমাদের স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্কিত এবং আমাদের বেঁচে থাকার সুযোগ বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি, উৎপাদন সরবরাহ শৃঙ্খল ও বৈজ্ঞানিক দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত। এই অতিমারির সময় এমআরএনএ টিকার ব্যবহার এবং জৈবপ্রযুক্তিতে দ্রুত অগ্রগতিও দেখা গিয়েছে, যা ভাইরাস বিশ্লেষণ ও টিকার বিকাশকে সক্ষম করে। টিকার জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে রাজনৈতিক লড়াই এবং উৎপাদন সরবরাহ শৃঙ্খলের উপর অব্যবহিত চাপ পরবর্তী প্রজন্মের থেরাপিউটিকস দক্ষতা বা তা তৈরির জন্য অবকাঠামোর অভাবযুক্ত দেশগুলির সামনে চ্যালেঞ্জগুলির এক বিশদ চিত্র তুলে ধরে। এটি অতিমারি প্রস্তুতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এমআরএনএ প্রযুক্তি দীর্ঘায়ু-সম্পর্কিত থেরাপিউটিকসের জন্যও উল্লেখযোগ্য। কারণ এটি সম্ভাব্য ভাবে জিনগত রোগ, সংক্রমণ ও ক্যানসারের চিকিৎসা করতে পারে। বার্ধক্য-সম্পর্কিত রোগ সংক্রান্ত অবস্থার চিকিৎসার জন্য বিদ্যমান ও উদীয়মান জিন থেরাপি একই রকম গুরুত্বপূর্ণ।
এই চিকিৎসাগুলি স্বাস্থ্য কূটনীতি ও বৈদেশিক সাহায্যের মাধ্যমে স্বাস্থ্যগত ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। যে সব দেশের সংস্থা এই চিকিৎসার বৌদ্ধিক সম্পত্তি নির্মাণ করেছে, তাদের জন্য থেরাপিউটিক কূটনীতি অর্থনৈতিক বাণিজ্য ও আলোচনায় একটি বড় ভূমিকা পালন করে। যে সব দেশের উৎপাদন অবকাঠামো এই নতুন থেরাপি প্রদান করছে, তাদের জন্য এটি দেশগুলিকে প্রাথমিক ভাবে সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলির মূল বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে জায়গা করে দেয়।
বৈজ্ঞানিক গবেষণার অগ্রগতি
দীর্ঘায়ু গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদার করার জন্য বিজ্ঞান কূটনীতিও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘায়ু-মনস্ক দেশগুলি সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করে এই সুযোগটিকে কাজে লাগাতে পারে এবং এর মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, তথ্যের বিশ্লেষণ ও মডেলিংয়ের জন্য গণনামূলক সম্পদের ব্যবহার, দীর্ঘায়ু গবেষণা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর এবং সরকার-অর্থায়িত যৌথ প্রকল্পের সূচনা।
অর্থনৈতিক সুযোগগুলিকে আরও উন্নত করার জন্য এটিকে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক শৃঙ্খলের পরিপূরক করা যেতে পারে এবং সংস্থা, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম, অ্যাক্সিলারেটর প্রোগ্রাম ও অন্য অংশীদারদের এ ক্ষেত্রে আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে। একটি দেশের আহ্বায়ক কর্তৃপক্ষকে কাজে লাগালে তা আন্তঃসীমান্ত অর্থনীতিগুলিকে সংযুক্ত করতে এবং আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক গতিশীলতা বৃদ্ধি করতে আরও সাহায্য করতে পারে।
আইআর্ট হল একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিশিষ্ট (এআই) আই স্ক্রিনিং সিস্টেম (চক্ষু পরীক্ষার ব্যবস্থা), যা বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন (রেটিনাকেন্দ্রের অবক্ষয়) এবং গ্লুকোমাটাস অপটিক স্নায়ুর ক্ষতি চিহ্নিত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড
দীর্ঘায়ু থেরাপিউটিকস ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বাজার বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ধরনের চিকিৎসা সংক্রান্ত নিয়মাবলি, সাধনী ও মানদণ্ডও বৃদ্ধি পাবে। এটি বিশ্বব্যাপী দীর্ঘায়ু স্বাস্থ্য নেতৃত্বের জন্য একটি ভাল সুযোগ। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সম্পর্কিত রোগনির্ণয়, যা রোগ শনাক্তকরণের মাধ্যমে রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে। আইআর্ট হল একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিশিষ্ট (এআই) আই স্ক্রিনিং সিস্টেম (চক্ষু পরীক্ষার ব্যবস্থা), যা বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন (রেটিনাকেন্দ্রের অবক্ষয়) এবং গ্লুকোমাটাস অপটিক স্নায়ুর ক্ষতি চিহ্নিত করতে পারে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে ক্লিনিক্যাল ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত। ভবিষ্যতে, আরও বেশি এআই দক্ষতাসম্পন্ন রোগনির্ণয়ের সাধনী উঠে আসবে। স্বাস্থ্য কূটনীতি কৌশল ও বিদেশি ত্রাণ প্যাকেজের মধ্যে এগুলিকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। এই প্রযুক্তিগুলি বিকাশের জন্য কম প্রযুক্তিগত ক্ষমতা ও কম সংস্থানযুক্ত দেশগুলি সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।
বর্তমানে দীর্ঘায়ুর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বৈশ্বিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রটি উন্মুক্ত এবং দেশগুলির কাছে তাদের দীর্ঘায়ু সংক্রান্ত উদ্ভাবন, গুণমান, মানদণ্ড ও সাধনীগুলি বিশ্বের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জাতীয় শক্তির সাধনী হিসেবে দীর্ঘায়ু
একটি দেশের সামরিক শক্তি… তা সে শিল্প বা রফতানি যাই হোক না কেন, তার চাইতেও সবচেয়ে মূল্যবান ও সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ হল দেশের জনগণ। বিশ্বব্যাপী জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে, তা হল জীবনযাত্রার মান। কিছু সময় আগে পর্যন্তও একটি দেশের সমৃদ্ধি বিদ্যুৎ, তার পর গাড়ি এবং তারও পর ইন্টারনেটের ব্যবহারের সুযোগের ভিত্তিতে পরিমাপ করা হত । বর্তমানে এআই সেই জায়গা করে নিয়েছে। এবং আগামী দিনে এআই মানুষকে দীর্ঘায়ু প্রদান করবে।
স্বাস্থ্য হল সম্পদ এবং যে দেশগুলি কৌশলগতভাবে এই সাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তিগত মুহূর্তটিকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বব্যাপী দীর্ঘায়ুর নেতা হয়ে উঠতে পারবে, তারা বিশ্বকে এমন কিছু প্রদান করতে সমর্থ হবে, যা ইতিপূর্বে কোনও দেশেই কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে প্রদান করেনি এবং তা হল দীর্ঘায়ুর উপহার।
লিডিয়া কোস্টোপোলুস অ্যাবানডান্স স্টুডিও কনসালটেন্সি-র প্রতিষ্ঠাতা, স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড ইমার্জিং টেকনোলজিস-এর সিনিয়র এবং ‘ইমাজিনেশন ডিলেমা: টুলস টু ওভারকাম ইট অ্যান্ড থ্রাইভ থ্রু ডিসরাপশন’ বইটির লেখক।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.