গাজা উপত্যকার পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে আসার জন্য আরব নেতারা মিশরের কায়রোতে একটি জরুরি বৈঠক সেরেছেন। ট্রাম্পের মিশর ও জর্ডনের ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে ‘রিভিয়েরা’তে (বা পৃথক উপকূলীয় অঞ্চল) পরিণত করার প্রস্তাব আরব নেতাদের নিজস্ব বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে।
কায়রোর ফলাফল প্রত্যাশামাফিকই থেকেছে এবং ট্রাম্পের পথে হেঁটেই ফিলিস্তিনি সমস্যা এবং হামাস ও ইজরায়েলের মধ্যে যুদ্ধের নিরিখে এই কায়রো ফলাফল আরব-নেতৃত্বাধীন সাময়িক শুশ্রুষা মাত্রই থেকেছে। গাজা উপত্যকায় হামাসের ভবিষ্যৎ আসলে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও প্রবাদপ্রতিম পুনর্গঠনমূলক প্রচেষ্টার কেন্দ্রে থাকা উচিত। এই শীর্ষ সম্মেলনে গাজার পুনর্গঠনের জন্য একটি নতুন নীলনকশা নির্মাণের জন্য ৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পরিকল্পনা অনুমোদন করা হলেও এটিতে আরও বিতর্কিত রাজনৈতিক প্রশ্নগুলি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। যেমন হামাসের প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হয়ে ওঠা এবং ইজরায়েলের নিরাপত্তা দ্বন্দ্বের সমাধান সংক্রান্ত প্রশ্ন। আরব প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য ছিল একটি বাফার তৈরি করা এবং শুধু মাত্র ট্রাম্প বা মিশর ও জর্ডনের পরিকল্পনার বিরুদ্ধেই নয়, বরং একই সঙ্গে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ক্রমবর্ধমান আখ্যানের নিরিখে নিছক দর্শক হয়ে থাকার পাশাপাশি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট উপস্থাপন করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল উভয়ই আরব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
আরব প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য ছিল একটি বাফার তৈরি করা এবং শুধু মাত্র ট্রাম্প বা মিশর ও জর্ডনের পরিকল্পনার বিরুদ্ধেই নয়, বরং একই সঙ্গে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ক্রমবর্ধমান আখ্যানের নিরিখে নিছক দর্শক হয়ে থাকার পাশাপাশি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট উপস্থাপন করা।
আগে এ কথা প্রকাশ্যে এসেছিল যে, মিশরের পরিকল্পনায় হামাস-নেতৃত্বাধীন সরকারকে প্রতিস্থাপন করার জন্য একটি প্রশাসনমূলক সহায়তা অভিযান তৈরি করা, মানবিক সহায়তামূলক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা এবং গাজা কী ভাবে পরিচালিত হবে, তার রূপরেখা দেওয়ার জন্য মূল সংস্থা হিসাবে কাজ করার বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রত্যাশিত ভাবে হামাস এই ধারণাটি প্রত্যাখ্যান করেছে। যদিও তারা আরব-নেতৃত্বাধীন প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে। কারণ এটি গাজার উপর তার রাজনৈতিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করেনি। কায়রো চুক্তির প্রস্তাবের আগে হামাসের সমস্যাটি কী ভাবে সর্বোত্তম উপায়ে মোকাবিলা করা যায়, সে সম্পর্কে পরিবর্তন আনা হয়েছিল কি না, তা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
আরব বিশ্বের জন্য তাদের আঞ্চলিক লক্ষ্যগুলির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা - যার মধ্যে ইজরায়েলের সঙ্গে কাজ সংক্রান্ত সম্পর্ককে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক গুরুত্বে রূপান্তরিত করা এবং ফিলিস্তিনি সঙ্কটের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অন্তর্ভুক্ত - অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে হামাসের আক্রমণ রিয়াধ ও আবুধাবির মতো রাজধানীতে একাধিক কর্মসূচিকে স্থগিত করে দেয় এবং গত দু’বছরে আরব শক্তিদের আবারও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে। যদিও তারা নিরপেক্ষ থাকার ইচ্ছা পোষণ করেছে। কারণ ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যে প্রতিযোগিতাকে মূল আঞ্চলিক ফাটল হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, ইজরায়েল স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোরের (আইএমইসি) মতো প্রকল্পগুলিতে পূর্ণ সম্ভাবনার বাস্তবায়নের জন্য রিয়াধের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সৌদি-ইজরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ অনিবার্য হওয়ার ধারণাটি যে ধারাবাহিকতার সঙ্গে ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই প্রচার করেছিল, তা হয়তো বিপরীতমুখীই ছিল। কারণ এই ধরনের স্বাভাবিকীকরণের আগে রিয়াধকে একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের দাবিতে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে বাধ্য করা হয়েছে।
ইজরায়েল স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোরের (আইএমইসি) মতো প্রকল্পগুলিতে পূর্ণ সম্ভাবনার বাস্তবায়নের জন্য রিয়াধের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
আর একটি অন্তর্নিহিত আশঙ্কা এই হতে পারে যে, গাজায় হামাসকে বলপূর্বক ভেঙে ফেলার ফলে ফিলিস্তিনি দলটি কেবল তাদের কিছু আরব অংশীদারের বিরুদ্ধেই নয়, বরং প্রবাদপ্রতিম আরব পথটিকে হামাসের আখ্যান, ইরানের সর্ব-সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের পক্ষে আরও সশক্ত করতে পারে এবং রাজনৈতিক ইসলামের মতো আদর্শগুলিকে নতুন করে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে। এটি আসলে এমন একটি ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থান, যা সৌদি ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (ইউএই) উভয়ই বছরের পর বছর ধরে অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছে। এমন একটি আশঙ্কাও অব্যাহত রয়েছে যে, এই ধরনের আদর্শগুলি পুনরুত্থিত হতে পারে ও তার পুনর্নির্মাণ ঘটতে পারে এবং ইসলামের অতি-রক্ষণশীল সংস্করণগুলিকে নতুন করে প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে, যা আঞ্চলিক অর্থনীতিকে উদারীকরণের সঙ্গে সংযুক্ত পরিকল্পনা এবং সেগুলিকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করে তোলার পরিপন্থী। এই প্রচেষ্টার সাফল্য সৌদি আরবের মতো রাষ্ট্রগুলির পুনর্নির্মাণের উপরও নির্ভর করে এবং গত কয়েক দশক ধরে বিশেষ করে পশ্চিমে তাদের কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়েছে তার উপরও। বিশ্লেষক হেশাম আলঘান্নাম তাঁর গবেষণায় তুলে ধরেছেন যে, রাজত্ব ‘রাজপরিবারের বৈধতা অর্জনকারী ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দূরে সরে গিয়ে উষ্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য রাখে; তবে এই পুনর্বিন্যাসের জন্য প্রদত্ত সম্ভাব্য মূল্য কমানোর উদ্দেশ্যে এটি যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।’ মধ্যপ্রাচ্যে গৃহীত এই সংবেদনশীল প্রকল্পগুলি বাতিল করলে বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।
ইতিমধ্যে ট্রাম্প সংঘাত বন্ধ করার জন্য তাঁর ‘চুক্তি’ সংক্রান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নীতির চেয়ে ব্যক্তিত্বকে প্রথমে প্রাধান্য দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দ্বারা পরিচালিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিজস্ব নির্বাচনী এলাকার জন্য একটি প্রধান অর্জন হল যুদ্ধের অবসান ঘটানো। ট্রাম্প বিশ্বাস করেন যে, যুদ্ধের অবসানের নেপথ্যে থেকেছে ঐতিহ্যবাহী মার্কিন রাজনৈতিক কাঠামো এবং এর মধ্যে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। এই লক্ষ্যে ট্রাম্প এমনকি হামাসের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করেছেন এবং ইজরায়েলের প্রাইম মিনিস্টার বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, শান্তিকে ত্বরান্বিত করা দাবির উদ্দেশ্যে চুক্তি প্রত্যাহার করার জন্য ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষার ঊর্ধ্বে বিচ্যুতিহীন ইজরায়েল-মার্কিন সম্পর্কও নয়। জানা গিয়েছে, ইজরায়েলিরা কেবল ‘অন্যান্য মাধ্যম’ ব্যবহার করে হামাসের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সরাসরি আলোচনার কথা জানতে পেরেছে এবং হোয়াইট হাউস ইজরায়েলকে এ নিয়ে কিছু জানায়নি।
নীতির চেয়ে ব্যক্তিত্বকে প্রথমে প্রাধান্য দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দ্বারা পরিচালিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিজস্ব নির্বাচনী এলাকার জন্য একটি প্রধান অর্জন হল যুদ্ধের অবসান ঘটানো। ট্রাম্প বিশ্বাস করেন যে, এর নেপথ্যে থেকেছে ঐতিহ্যবাহী মার্কিন রাজনৈতিক কাঠামো এবং এর মধ্যে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয়ই অন্তর্ভুক্ত।
আরব নেতৃত্বের কাছে গাজা প্রসঙ্গের ফলাফল নির্ধারণ করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের জন্য অপ্রীতিকর হতে পারে। আরব রাষ্ট্রগুলি আদর্শগত ভাবে গাজায় হামাসকে সমর্থন করতে চাইলেও আঞ্চলিক ও বিশ্বব্যাপী উভয় ক্ষেত্রেই বিভিন্ন স্বার্থের সন্তুষ্টির অনুকূল এমন কোনও বিকল্প তৈরি করা যেতে পারে। তবে এই প্রশ্নের উত্তর এখনও কারও কাছে নেই বলেই মনে হয়। গাজা সঙ্কট নতুন নয় এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক স্পষ্টবাদিতার বিধ্বংসী প্রকৃতি ও কৌশলের অভাবের কারণে এটির দ্রুত সমাধানের আশা রাখা উচিত নয় এবং এই পরিস্থিতি খারাপ বিকল্প ও বাধ্যতামূলক সুযোগের দিকে চালিত করতে পারে।
কবীর তানেজা অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ প্রোগ্রামের ডেপুটি ডিরেক্টর ও ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.