২০২৪ সালের ১৬ জুন অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক ওকিনাওয়া প্রিফেকচারাল অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব জাপান (সিডিপি) এবং সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি-সহ শাসক শিবির ৪৮টির মধ্যে ২০টি আসন পেয়েছে। অন্য দিকে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি), কোমেইতো এবং নিপ্পন ইশিন নো কাই নিয়ে গঠিত বিরোধী জোট ২৮টি আসন পেয়েছে। সাম্প্রতিক স্লাশ ফান্ড কেলেঙ্কারির প্রভাবকে শাসকদলের বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর এলডিপি-র কৌশলটি কার্যকর হয়েছে বলেই মনে হয়। কারণ যে ২০টি আসনে এলডিপি প্রার্থী দাঁড়িয়েছিলেন, সেই সব ক’টি আসনেই এলডিপি প্রার্থী জিতেছিলেন। সম্প্রতি স্লাশ ফান্ড কেলেঙ্কারির পরে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর ওকিনাওয়া প্রিফেকচারাল অ্যাসেম্বলি নির্বাচনটি প্রাইম মিনিস্টার ফুমিও কিশিদার প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন জাপানের প্রধান বিরোধী দলের স্ন্যাপ নির্বাচনের আহ্বান কিশিদার পক্ষের জনমতকে পরীক্ষার মুখে ফেলতে চাইছে এবং এর কারণ স্বরূপ বিরোধীপক্ষ ক্ষমতাসীন এলডিপি-র মধ্যে স্লাশ ফান্ড কেলেঙ্কারির কারণে জনগণের আস্থার ঘাটতিকেই তুলে ধরেছেন। এক দিকে যখন এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বা অ্যাক্টিং সেক্রেটারি জেনারেল তোমোমি ইনাদা রাজনৈতিক তহবিল বিধি কঠোর করার জন্য একটি প্রস্তাবিত বিলের কথা তুলে ধরেছেন - যা অন্যান্য গোষ্ঠীর সমর্থন পেয়েছে এবং একই ধরনের কেলেঙ্কারি রোধ করার লক্ষ্যে কাজ করেছে – অন্য দিকে স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে যে, কিশিদা এলডিপি-র নেতৃত্বে নির্বাচনী দৌড় হওয়া পর্যন্ত স্ন্যাপ নির্বাচনের বিষয়টিকে পিছিয়ে দিতে পারেন।
এই ঘটনাপ্রবাহ প্রাইম মিনিস্টার হিসেবে তাঁর মেয়াদকালে কিশিদার চ্যালেঞ্জের পরিমাণ বৃদ্ধি করে, যে সময়কালটি তাঁর পূর্বসূরি শিনজো আবের নীতির সামান্য পরিবর্তন ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সংমিশ্রণ প্রত্যক্ষ করেছে। কিশিদা আয়ের পুনর্বণ্টন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য মোকাবিলার লক্ষ্যে নতুন উদ্যোগ প্রবর্তন করার সময়, বিশেষ করে বৈদেশিক নীতি এবং অর্থনৈতিক কৌশলে আবের উত্তরাধিকার সমুন্নত রাখার চেষ্টা করেছেন। তবে জনসমর্থন কমে যাওয়া ও দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে তাঁর প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই ঘটনাপ্রবাহ প্রাইম মিনিস্টার হিসেবে তাঁর মেয়াদকালে কিশিদার চ্যালেঞ্জের পরিমাণ বৃদ্ধি করে, যে সময়কালটি তাঁর পূর্বসূরি শিনজো আবের নীতির সামান্য পরিবর্তন ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সংমিশ্রণ প্রত্যক্ষ করেছে।
কিশিদা আন্তর্জাতিক মঞ্চে জাপানের ভূমিকার জন্য আবের দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক দিকগুলি বজায় রেখেছেন, বিশেষ করে একটি অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের (এফওআইপি) উপর জোর দেওয়া এবং একটি উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতিরক্ষা সুনিশ্চিত করা, যাতে জাপান আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবেই থাকতে পারে। তাঁর প্রশাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে জাপানের জোটকে শক্তিশালী করেছে এবং এর ফলে এই অঞ্চলে চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব প্রতিহত করার জন্য আবের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কাঠামোকে আরও সশক্ত করেছে। সামগ্রিক ভাবে, কিশিদা সূক্ষ্ম ভাবে নিজেকে তাঁর পূর্বসূরীর থেকে আলাদা করেছেন, ধীরে ধীরে এমন এক অবিচল কূটনীতি চালিয়ে যাচ্ছেন, যা আবের মেয়াদকে চিহ্নিত করেছে।
আবে এবং কিশিদা উভয়েই ১৯৯৩ সালে ডায়েটে যোগ দিয়েছিলেন এবং বেশ কয়েক বছর ধরে সহযোগিতা করেছিলেন। ২০০৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কিশিদা প্রাইম মিনিস্টার হিসেবে আবের প্রথম মেয়াদে ওকিনাওয়া এবং উত্তর অঞ্চল বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ বা ২০১৮ সালে মধ্যপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার পরে এবং সুগা-র প্রশাসন থেকে বাদ পড়ার পরে কিশিদার রাজনৈতিক জীবন অনিশ্চিত বলে মনে হয়েছিল। ২০১২ সালে যখন আবে ক্ষমতায় ফিরে আসেন, তখন তিনি কিশিদাকে ফরেন মিনিস্টার হিসেবে নিযুক্ত করেন। এটি এমন এক পদ যেখানে কিশিদা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জাপানের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এলডিপি পলিসি অফিসের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এবং নিজেকে একজন সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে তুলে ধরেছেন। ২০২০ সালে ইয়োশিহিদে সুগা-র প্রতি আবের সমর্থন সত্ত্বেও সুগা-র পদত্যাগের ফলে আবে কিশিদাকে সমর্থন করেছিলেন, যিনি প্রথম দফার ভোটে সানে তাকাইচি হেরে যাওয়ার পরে দলীয় নেতৃত্ব পেতে সমর্থ হন। পারমাণবিক শক্তি এবং বৈদেশিক বিষয়ে তাঁর মধ্যপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে পার্টির নেতাদের এবং এলডিপি-র প্রধান দলগুলির সমর্থন পেতে সাহায্য করে। নব্য উদারনীতির অবসানের বিষয়ে কিশিদার অবস্থান আবের অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে সামান্যই ভিন্ন, যা আবের অর্থনৈতিক কৌশলগুলি থেকে বিচ্যুতির বদলে একটি ধারাবাহিকতাকেই দর্শায়। এর পাশাপাশি বৈদেশিক ও অর্থনৈতিক নীতিতে মিল থাকা সত্ত্বেও কিশিদার রাজনৈতিক শৈলী এবং ধরন আবের থেকে উল্লেখযোগ্য রকমের আলাদা।
কিশিদা জাপানের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে রাজস্ব উদ্দীপনা, আর্থিক সহজীকরণ এবং কাঠামোগত সংস্কারের সমন্বয়ে ‘অ্যাবেনোমিক্স’-এর গতিকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। কিশিদা উল্লেখযোগ্য সরকারি ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, বিশেষ করে কোভিড-১৯ অতিমারি দ্বারা সৃষ্ট অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ। তাঁর প্রশাসন ডিজিটাল রূপান্তর এবং দূষণহীন বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যা জাপানের অর্থনীতির আধুনিকীকরণে আবের উদ্যোগকেই দর্শায়। যাই হোক, কিশিদা আয় পুনর্বণ্টন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য মোকাবিলায় জোর দিয়ে নিজেকে আলাদা করার চেষ্টা করেছেন। এই ভাবে তাঁর পূর্বসূরির অর্থনৈতিক নীতিতে কিশিদা একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।
কিশিদা জাপানের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে রাজস্ব উদ্দীপনা, আর্থিক সহজীকরণ এবং কাঠামোগত সংস্কারের সমন্বয়ে ‘অ্যাবেনোমিক্স’-এর গতিকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন।
বৈদেশিক সম্পর্কের প্রতি কিশিদার দৃষ্টিভঙ্গি কূটনীতি ও দৃঢ়তার একটি বাস্তবসম্মত মিশ্রণ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন যে, জাপানের উচিত ‘বৃহত্তর দায়িত্ব গ্রহণ করা’ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আরও সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করা। তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলির সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং জাপানের কৌশলগত অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করার জন্য আবের প্রচেষ্টাকে অব্যাহত রেখেছেন। আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঐকমত্যের গুরুত্ব স্বীকার করে কিশিদার প্রশাসন দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক সংশোধন ও জোরদার করারও চেষ্টা করেছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা এবং আগ্রাসনের নিন্দা-সহ ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রতি তাঁর দ্রুত এবং নিষ্পত্তিমূলক প্রতিক্রিয়া ক্রিমিয়া দখলের সময় আবের আরও সতর্ক অবস্থান থেকে প্রস্থানকেই দর্শায় এবং আন্তর্জাতিক নিয়মের প্রতিরক্ষায় সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য কিশিদার প্রস্তুতির কথাই তুলে ধরে। আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রতি জাপানের প্রতিশ্রুতিকে দৃঢ় ভাবে উপস্থাপন করার জন্য কিশিদা ন্যাটোর বৈঠকে যোগদানকারী প্রথম জাপানি প্রাইম মিনিস্টার। আবের মেয়াদে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে, বিশেষ করে প্রাইম মিনিস্টার টনি অ্যাবটের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক জোরদার হয়েছিল, যার ফলে দুই দেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপান সমন্বিত একটি আঞ্চলিক গোষ্ঠী অর্থাৎ কোয়াড-এর প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ছিল ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য একটি উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা। ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক (এফওআইপি) উদ্যোগের প্রচারের মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া এবং ফিলিপিন্সের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপনে সফল হয়ে কিশিদা কোয়াড ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রতিরক্ষা নীতির পরিপ্রেক্ষিতে, কিশিদা জাপানের সামরিক সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে এবং মিত্র দেশগুলির সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতাকে আরও গভীর করে আবের উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। তিনি জাপানের শান্তিবাদী সংবিধানের পুনর্ব্যাখ্যাকে সমর্থন করেছেন এবং আরও সক্রিয় প্রতিরক্ষা ভঙ্গি অনুসরণ করার কথা বলেছেন। দক্ষিণ চিন সাগরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বিরোধের মাঝে কিশিদা চিনের প্রতি কঠোর নীতি গ্রহণ করেছেন এবং জাপানের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য প্রতিবেশী দেশগুলির লক্ষ্যে পৌঁছনোর উদ্দেশ্যে জাপানের সক্ষমতা অর্জনকে সমর্থন করেছেন।
প্রতিরক্ষা নীতির পরিপ্রেক্ষিতে, কিশিদা জাপানের সামরিক সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে এবং মিত্র দেশগুলির সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতাকে আরও গভীর করে আবের উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন।
এই ধারাবাহিকতা সত্ত্বেও, কিশিদা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ঐকমত্যচালিত পন্থা অবলম্বন করে তাঁর নেতৃত্বের শৈলীকে আলাদা করেছেন। তিনি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার উপর জাপানের কৌশলগত মনোযোগ বজায় রেখে আয়ের বৈষম্য মোকাবিলা এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নত করার জন্য তাঁর নিজস্ব উদ্যোগ প্রবর্তন করে কার্যকরী ভাবে আবের উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। তাঁর মেয়াদ এখন পর্যন্ত ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিসরের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সময় তাঁর পূর্বসূরির অর্জনগুলি সংরক্ষণের একটি সতর্ক ভারসাম্যকেই প্রতিফলিত করে।
কিশিদা স্লাশ ফান্ড কেলেঙ্কারির প্রতিক্রিয়া হিসাবে সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নিয়েছেন। আবে দলের সিনিয়র কর্মকর্তাদের উপর জরিমানা আরোপ করেছেন। যেহেতু দেশীয় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলি কিশিদার নেতৃত্বকে পরীক্ষা করে এবং তাঁর প্রশাসনের নীতি ও উদ্যোগগুলিকে টিকিয়ে রাখার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে, তাই অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক উভয় রাজনৈতিক পরিসরে পথ খুঁজে নেওয়ার জন্য কিশিদাকে অবশ্যই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হবে।
প্রত্নশ্রী বসু অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের অ্যাসোসিয়েট ফেলো।
The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.