Authors : Madhavi Jha | Shoba Suri

Published on Feb 22, 2025 Updated 0 Hours ago

কোভিড-১৯ অতিমারির পর থেকে রক্তাল্পতার ঘটনা বেড়েই চলেছে এবং এই সমস্যা মোকাবিলায় ভারতের একটি সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য পদ্ধতির  প্রয়োজন

ভারতে রক্তাল্পতা: একটি অলক্ষিত জনস্বাস্থ্য সঙ্কট

যেখানে অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতাকে প্রায়শই একটি নীরব অতিমারি হিসাবে বর্ণনা ,করা হয়, সেখানে বিশ্বে সর্বাধিক সংখ্যক রক্তাল্পতায় ভুগছেন এমন মানুষের বাস ভারতেই। মোকাবিলার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও রক্তাল্পতা একটি উল্লেখযোগ্য জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসাবে রয়ে গিয়েছে এবং সাম্প্রতিক দশকগুলিতে এর প্রকোপ অব্যাহত ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রক্তাল্পতা দুর্বলতা, ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, ফ্যাকাশে গাত্রবর্ণ, শরীরে ঠান্ডা ভাব, হালকা মাথাব্যথা, দ্রুত হৃদস্পন্দন এবং মনোযোগ দিতে অসুবিধার মতো লক্ষণগুলির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। সর্বোপরি রক্তাল্পতা এমন একটি দুষ্ট চক্রের সৃষ্টি করে, যেখানে দুর্বলতা উৎপাদনশীলতা সুস্থতা হ্রাস করার পাশাপাশি মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু কম ওজনসম্পন্ন শিশুর জন্মের ঝুঁকি তৈরি করে। রক্তাল্পতার সুদূরপ্রসারী সামাজিক অর্থনৈতিক পরিণতি রয়েছে, যা শারীরিক জ্ঞানগত বিকাশকে উল্লেখযোগ্য ভাবে ব্যাহত করে।

ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (এনএফএইচএস-৫) ২০১৯-২০২১ তথ্য অনুসারে, ভারতে ৫৭ শতাংশ মহিলা এবং ৬৭.১ শতাংশ শিশু রক্তশূন্য (যেমনটা নীচের চিত্রে দর্শানো হয়েছে)। প্রজননক্ষম নারী, ছোট শিশু গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে রক্তাল্পতার প্রকোপ বেশি। রক্তাল্পতার হার বৃদ্ধি ভারতের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার পদ্ধতিগত সমস্যাগুলিকেই তুলে ধরে, যেগুলি জরুরি ভিত্তিতে সমাধান করা দরকার।

 Anaemia In India A Silent Public Health Crisis

সূত্র: আইআইপিএস

বিগত দুই দশকে, ভারতে রক্তাল্পতার প্রকোপ এনএফএইচএস-৩ ও এনএফএইচএস-৪-এর মধ্যে কমেছে এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ রক্তাল্পতা-সম্পর্কিত সূচকগুলির উন্নতি হয়েছে প্রসবপূর্ব পরিচর্যা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বৃদ্ধির কারণে মাতৃস্বাস্থ্য পরিষেবা-সহ গর্ভবতী মহিলাদের মধ্যে এ হেন উন্নতি প্রত্যক্ষ করা গিয়েছে। সর্বোপরি, শিশু স্বাস্থ্য সূচকগুলি উন্নত হয়েছে, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের উন্নত পুষ্টি টিকা দেওয়ার হার বেড়েছে। যাই হোক, সব বিভাগেই এনএফএইচএস-৫-এ রক্তাল্পতার প্রকোপ আবার বৃদ্ধি পেয়েছে২০১৫-১৬ এবং ২০১৯-২১ সালে মহিলাদের মধ্যে রক্তাল্পতার মাত্রা ৫৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৭ শতাংশ হয়েছে। সব ধরনের মহিলার মধ্যেই রক্তাল্পতার সামগ্রিক প্রবণতা ক্রমাগত বাড়ছে এবং ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে। শহুরে এলাকার (৬৪.২ শতাংশ) তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় (৬৮.৩ শতাংশ) বসবাসকারী শিশুদের মধ্যে রক্তাল্পতা বেশি ছিল, যা সরাসরি মায়েদের নিম্ন শিক্ষার স্তর এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত। রক্তাল্পতায় ভোগা মায়েদের বাচ্চাদের রক্তাল্পতা হওয়ার সম্ভাবনা নন-অ্যানিমিক (যাঁদের রক্তাল্পতার সমস্যা নেই) মায়েদের বাচ্চাদের তুলনায় বেশি এবং এই প্রকোপ জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যার সঙ্গেই বৃদ্ধি পায়। বয়ঃসন্ধিকালীন নারীরা – যে সংখ্যা আসলে সমস্ত ভারতীয় নারীর প্রায় ১৭ শতাংশ - বিশেষ করে রক্তাল্পতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কারণ জীবনের এই পর্যায়ে সংঘটিত স্বতন্ত্র শারীরিক শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনগুলির দরুন ঋতুস্রাবের সময় কম আয়রনসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ নানাবিধ ক্ষতির দরুন এমনটা ঘটে থাকেফোলেট ও ভিটামিন বি১২-এর মতো অন্যান্য খাদ্যতালিকাগত ঘাটতির জন্য বয়ঃসন্ধিকালীন নারীরা ঝুঁকির সম্মুখীন হন, কারণ এই উপাদানগুলি লোহিত রক্তকণিকা সংশ্লেষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

রক্তাল্পতায় ভোগা মায়েদের বাচ্চাদের রক্তাল্পতা হওয়ার সম্ভাবনা নন-অ্যানিমিক (যাঁদের রক্তাল্পতার সমস্যা নেই) মায়েদের বাচ্চাদের তুলনায় বেশি এবং এই প্রকোপ জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যার সঙ্গেই বৃদ্ধি পায়।

শিশু প্রজননক্ষম মহিলাদের মধ্যে রক্তাল্পতা কোভিড-১৯-এর ফলে বেড়েছেপুষ্টি কর্মসূচি স্বাস্থ্য পরিষেবাগুলিতে লকডাউন বা অন্তরিন সম্পর্কিত বাধার দরুন প্রয়োজনীয় চিকিত্সা খাদ্যতালিকাগত পরিপূরক পাওয়ার বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। পূর্ব ভারতের একটি টারশিয়ারি কেয়ার হসপিটালে করা আন্তঃবিভাগীয় গবেষণায় কোভিড-১৯-এর জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৮০ শতাংশ মহিলার মধ্যে রক্তাল্পতা লক্ষ করা গিয়েছে। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে, কম হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বৃহত্তর মৃত্যুর হার গুরুতর কোভিড-১৯-এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই সব কিছুই দর্শায় যে, অতিমারি চলাকালীন রোগীর স্বাস্থ্যের উপর প্রাক-বিদ্যমান রক্তাল্পতা একটি বড় প্রভাব ফেলেছিল। হেলথ ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের তথ্য অনুসারে, সব গোষ্ঠীতেই ২০১৭-১৮ এবং ২০১৯-২০-র মধ্যে আয়রন ফলিক অ্যাসিড (আইএফএ) পরিপূরকের উন্নতি দেখেছে। তা সত্ত্বেও, কোভিড-১৯-এর পরবর্তী অতিমারি মূল্যায়নগুলিতে দেখা গিয়েছে যে, কিছু অগ্রগতি অর্জিত হলেও এই সময়ের মধ্যে রক্তাল্পতার প্রকোপ উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস  পায়নি।

ভারতীয়দের অধিকাংশ মানুষই এমন খাদ্য গ্রহণ করেন, যেগুলি আয়রন, ফোলেট ভিটামিন বি১২-এর দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নয়’ বা প্রকৃত ভাবে অপ্রতুল। গর্ভাবস্থায় বা প্রসবোত্তর সময়কালে সীমিত খাদ্যসমূহ সাংস্কৃতিক বিশ্বাস আচার-আচরণ থেকে উদ্ভূত হতে পারে, যা খাদ্যের ঘাটতি সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে মহিলারা পর্যাপ্ত পুষ্টি পান না, যা রক্তাল্পতার দিকে চালিত করে। রক্তাল্পতার প্রকোপ প্রায়আর্থ-সামাজিক কারণ দ্বারা প্রভাবিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে প্রান্তিক অবস্থা, নিম্ন আয়, স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ, আর্থিক স্বাধীনতার অভাব, সীমিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্তৃত্ব নিরক্ষরতা। এইচআইভি-র (হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস) মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগ, ম্যালেরিয়া, টিবি (যক্ষ্মা) পরজীবী সংক্রমণ রক্তাল্পতার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে। ঝাড়খণ্ড বিহারে রক্তাল্পতার উচ্চ প্রকোপ দেখা গিয়েছে, যা উচ্চ মাত্রার দারিদ্র্য এবং পুষ্টি ও চিকিৎসায় সীমিত সুযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। শিশু কিশোর-কিশোরীদের রক্তাল্পতার ফলে বুদ্ধিবৃত্তিগত দুর্বলতা, দুর্বল শিক্ষাগত কর্মক্ষমতা বামনত্ব দেখা যায় এবং এই সব কিছুই শিক্ষাগত অর্জন অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি বয়ে আনতে পারে। রক্তাল্পতা কমানোর জন্য বেশ কয়েকটি সরকারি প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অগ্রগতি ধীর থেকেছে এবং বর্তমান তথ্য দর্শায় যে, সংবেদনশীল  জনসংখ্যার মধ্যে রক্তাল্পতার ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে।

শিশু কিশোর-কিশোরীদের রক্তাল্পতার ফলে বুদ্ধিবৃত্তিগত দুর্বলতা, দুর্বল শিক্ষাগত কর্মক্ষমতা বামনত্ব দেখা যায় এবং এই সব কিছুই শিক্ষাগত অর্জন অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি বয়ে আনতে পারে।

জীবনচক্র পদ্ধতি ব্যবহার করে মা, শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে রক্তাল্পতার প্রকোপ কমাতে ২০১৮ সালে অ্যানিমিয়ামুক্ত ভারত (এএমবি) কৌশলটি চালু করা হয়েছিল। এই কর্মসূচিতে একটি ৬x৬x৬ কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে, যার মধ্যে ছটি হস্তক্ষেপ, ছয়টি লক্ষ্যযুক্ত সুবিধাভোগী বিভাগ এবং ছটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছেসরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করা, চাহিদা তৈরি করা এবং রক্তাল্পতার পুষ্টি ও অপুষ্টিজনিত কারণগুলিকে মোকাবিলা করার জন্য শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ করার উদ্দেশ্যেও এটি কার্যকর ছিলএএমবি আরও সর্বাত্মক জাতীয় পুষ্টি পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, যার মধ্যে রয়েছে মিশন পোষণ ২.০, যা অন্যান্য পুষ্টি কর্মসূচিকে একত্র করে এবং খাদ্যের দৃঢ়তা, খাদ্যের বৈচিত্র্য বাজরার ব্যবহার প্রচারে মনোযোগ দেয়। খাদ্যতালিকাগত ব্যবধান পূরণ করতে পোষণ ২.০-এর অধীনে পুষ্টি সচেতনতা উদ্যোগগুলি পুষ্টিকর, আঞ্চলিক খাবারের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যকে উন্নত করার চেষ্টা চালায়খাদ্য দৃঢ়ীকরণ কর্মসূচি কৌশলগত ভাবে প্রধান খাদ্যে অত্যাবশ্যক মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট যোগ করে এবং পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম ইন্টিগ্রেটেড চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসের সাহায্যে দুর্বল গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছনোর মাধ্যমে পুষ্টির ফলাফলগুলিকে উন্নত করতে চায়।

পুষ্টি, স্বাস্থ্য সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে রক্তাল্পতাকে কার্যকর ভাবে মোকাবিলা করার জন্য একটি বহুমুখী পদ্ধতির প্রয়োজন। ঝুঁকিপূর্ণ জনসংখ্যার জন্য আয়রন গ্রহণ বাড়ানো যেতে পারে এবং তার জন্য শাক-সবজি, লেবু, বাদাম সুরক্ষিত খাদ্যশস্য-সহ আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের বর্ধিত ব্যবহারের পাশাপাশি খাদ্যের বৈচিত্র্যের উপর শিক্ষা প্রদান করা জরুরি। এই গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিগুলি যাতে বিস্তৃত ভাবে পাওয়া যায়, তা সুনিশ্চিত করার জন্য মূল খাবারগুলিতে আয়রন অন্যান্য খনিজ যোগ করতে হবে। স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে আয়রন ফলিক অ্যাসিড (আইএফএ) পরিপূরক মেনে চলার বিষয়টি সুনিশ্চিত করাপাশাপাশি প্রতিকূল প্রভাবগুলি পরিচালনা করলে তা রক্তাল্পতা প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করতে পারে। শিরার ভিতর থেকে রক্ত নিয়ে নমুনা পরীক্ষা করা যায়…  এ হেন সুনির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক যন্ত্র ব্যবহার করে রক্তাল্পতা নির্ধারণ কৌশলগুলিকে উন্নত করলে তা রক্তাল্পতা নির্ণয় চিকিত্সার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে। এ হেন নিরীক্ষণ রক্তাল্পতা প্রতিরোধ নিরাময়ের উদ্দেশ্যে বাবা-মাকে নির্দিষ্ট পরামর্শ প্রদানের জন্য গোষ্ঠীভিত্তিক স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষমতায়নের ভূমিকাকেও দর্শায়। গর্ভবতী মহিলা, স্তন্যদানকারী মা এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু-সহ উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীগুলির উপর মনোনিবেশ করে রক্তাল্পতা প্রতিরোধের জন্য অঞ্চলনির্দিষ্ট লক্ষ্যযুক্ত পদক্ষেপগুলি বাস্তবায়ন করতে হবে।

রক্তাল্পতা প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনার কৌশলগুলির জন্য ক্লিনিক্যাল উপাদানগুলির পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, খাদ্যতালিকাগত এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষিত বিবেচনা করে ভারতকে এমন একটি সামগ্রিক পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে, যাতে রক্তাল্পতার অন্তর্নিহিত কারণগুলি মোকাবিলা করতে সম্ভব হয়।

 


মাধবী ঝা অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের রিসার্চ ইন্টার্ন।

শোভা সুরি অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের হেলথ ইনিশিয়েটিভ-এর সিনিয়র ফেলো।

The views expressed above belong to the author(s). ORF research and analyses now available on Telegram! Click here to access our curated content — blogs, longforms and interviews.